আমার মাঝারে যে আছে কে গো সে কোন্ বিরহিণী নারী? আপন করিতে চাহিনু তাহারে, কিছুতেই নাহি পারি। রমণীরে কে বা জানে-- মন তার কোন্খানে। সেবা করিলাম দিবানিশি তার, গাঁথি দিনু গলে কত ফুলহার, মনে হল সুখে প্রসন্নমুখে চাহিল সে মোর পানে। কিছু দিন যায়,একদিন হায় ফেলিল নয়নবারি-- "তোমাতে আমার কোনো সুখ নাই' কহে বিরহিণী নারী। রতনে জড়িত নূপুর তাহারে পরায়ে দিলাম পায়ে, রজনী জাগিয়া ব্যজন করিনু চন্দন-ভিজা বায়ে। রমণীরে কে বা জানে-- মন তার কোন্খানে। কনকখচিত পালঙ্ক'পরে বসানু তাহারে বহু সমাদরে, মনে হল হেন হাসিমুখে যেন চাহিল সে মোর পানে। কিছু দিন যায়, লুটায়ে ধুলায় ফেলিল নয়নবারি-- "এ-সবে আমার কোনো সুখ নাই' কহে বিরহিণী নারী। বাহিরে আনিনু তাহারে, করিতে হৃদয়দিগ্বিজয়। সারথি হইয়া রথখানি তার চালানু ধরণীময়। রমণীরে কে বা জানে-- মন তার কোন্খানে। দিকে দিকে লোক সঁপি দিল প্রাণ, দিকে দিকে তার উঠে চাটুগান, মনে হল তবে দীপ্ত গরবে চাহিল সে মোর পানে। কিছু দিন যায়,মুখ সে ফিরায়, ফেলে সে নয়নবারি-- "হৃদয় কুড়ায়ে কোনো সুখ নাই' কহে বিরহিণী নারী। আমি কহিলাম,"কারে তুমি চাও ওগো বিরহিণী নারী।' সে কহিল,"আমি যারে চাই,তার নাম না কহিতে পারি।' রমণীরে কে বা জানে-- মন তার কোন্খানে। সে কহিল,"আমি যারে চাই তারে পলকে যদি গো পাই দেখিবারে, পুলকে তখনি লব তারে চিনি চাহি তার মুখপানে।' দিন চলে যায়, সে কেবল হায় ফেলে নয়নের বারি-- অজানারে কবে আপন করিব' কহে বিরহিণী নারী।
যে গান গাহিয়াছিনু কবেকার দক্ষিণ বাতাসে সে গান আমার কাছে কেন আজ ফিরে ফিরে আসে শরতের অবসানে। সেদিনের সাহানার সুর আজি অসময়ে এসে অকারণে করিছে বিধুর মধ্যাহ্নের আকাশেরে; দিগন্তের অরণ্যরেখায় দূর অতীতের বাণী লিপ্ত আছে অস্পষ্ট লেখায়, তাহারে ফুটাতে চাহে। পথভ্রান্ত করুণ গুঞ্জনে মধু আহরিতে ফিরে, সেদিনের অকৃপণ বনে যে চামেলিবল্লী ছিল তারি শূন্য দানসত্র হতে। ছায়াতে যা লীন হল তারে খোঁজে নিষ্ঠুর আলোতে। শীতরিক্ত শাখা ছেড়ে পাখি গেছে সিন্ধুপারে চলি, তারি কুলায়ের কাছে সে কালের বিস্মৃত কাকলি বৃথাই জাগাতে আসে। যে তারকা অস্তে গেল দূরে তাহারি স্পন্দন ও-যে ধরিয়া এনেছে নিজ সুরে।
ওই অমল হাতে রজনী প্রাতে আপনি জ্বাল' এই তো আলো-- এই তো আলো। এই তো প্রভাত, এই তো আকাশ, এই তো পূজার পুষ্পবিকাশ, এই তো বিমল, এই তো মধুর, এই তো ভালো-- এই তো আলো-- এই তো আলো। আঁধার মেঘের বক্ষে জেগে আপনি জ্বাল' এই তো আলো-- এই তো আলো। এই তো ঝঞ্ঝা তড়িৎ-জ্বালা, এই তো দুখের অগ্নিমালা, এই তো মুক্তি, এই তো দীপ্তি, এই তো ভালো-- এই তো আলো-- এই তো আলো।