কাঁকনজোড়া এনে দিলেম যবে ভেবেছিলেম হয়তো খুশি হবে। তুলে তুমি নিলে হাতের 'পরে, ঘুরিয়ে তুমি দেখলে ক্ষণেক-তরে, পরেছিলে হয়তো গিয়ে ঘরে, হয়তো বা তা রেখেছিলে খুলে। এলে যেদিন বিদায় নেবার রাতে কাঁকন-দুটি দেখি নাই তো হাতে, হয়তো এলে ভুলে। দেয় যে জনা কী দশা পায় তাকে। দেওয়ার কথা কেনই মনে রাখে। পাকা যে ফল পড়ল মাটির টানে শাখা আবার চায় কি তাহার পানে। বাতাসেতে উড়িয়ে-দেওয়া গানে তারে কি আর স্মরণ করে পাখি। দিতে যারা জানে এ সংসারে এমন করেই তারা দিতে পারে কিছু না রয় বাকি। নিতে যারা জানে তারাই জানে, বোঝে তারা মূল্যটি কোন্খানে। তারাই জানে বুকের রত্নহারে সেই মণিটি কজন দিতে পারে হৃদয় দিয়ে দেখিতে হয় যারে -- যে পায় তারে পায় সে অবহেলে। পাওয়ার মতন পাওয়া যারে কহে সহজ বলেই সহজ তাহা নহে, দৈবে তারে মেলে। ভাবি যখন ভেবে না পাই তবে দেবার মতো কী আছে এই ভবে। কোন্ খনিতে কোন্ ধনভাণ্ডারে সাগরতলে কিম্বা সাগরপারে যক্ষরাজের লক্ষমণির হারে যা আছে তা কিছুই তো নয় প্রিয়ে! তাই তো বলি যা কিছু মোর দান গ্রহণ করেই করবে মূল্যবান আপন হৃদয় দিয়ে।
মধ্যাহ্নে বিজন বাতায়নে সুদূর গগনে কী দেখে সে ধানের খেতের পরপারে-- নিরালা নদীর পথে দিগন্তে সবুজ অন্ধকারে যেখানে কাঁঠাল জাম নারিকেল বেত প্রসারিয়া চলেছে সংকেত অজানা গ্রামের, সুখ দুঃখ জন্ম মৃত্যু অখ্যাত নামের। অপরাহ্নে ছাদে বসি এলোচুল বুকে পড়ে খসি, গ্রন্থ নিয়ে হাতে উদাস হয়েছে মন সে যে কোন্ কবিকল্পনাতে। সুদূরের বেদনায় অতীতের অশ্রুবাষ্প হৃদয়ে ঘনায়। বীরের কাহিনী না-দেখা জনের লাগি তারে যেন করে বিরহিণী। পূর্ণিমানিশীথে স্রোতে-ভাসা একা তরী যবে সকরুণ সারিগীতে ছায়াঘন তীরে তীরে সুপ্তিতে সুরের ছবি আঁকে উৎসুক আকাঙক্ষা জেগে থাকে নিষুপ্ত প্রহরে, অহৈতুক বারিবিন্দু ঝরে আঁখিকোণে; যুগান্তরপার হতে কোন্ পুরাণের কথা শোনে। ইচ্ছা করে সেই রাতে লিপিখানি লেখে ভূর্জপাতে লেখনীতে ভরি লয়ে দুঃখে-গলা কাজলের কালি-- নাম কি খেয়ালী।