বাহির হইতে দেখো না এমন করে, আমায় দেখো না বাহিরে। আমায় পাবে না আমার দুখে ও সুখে, আমার বেদনা খুঁজো না আমার বুকে, আমায় দেখিতে পাবে না আমার মুখে কবিরে খুঁজিছ যেথায় সেথা সে নাহি রে। সাগরে সাগরে কলরবে যাহা বাজে, মেঘগর্জনে ছুটে ঝঞ্ঝার মাঝে, নীরব মন্দ্রে নিশীথ-আকাশে রাজে আঁধার হইতে আঁধারে আসন পাতিয়া-- আমি সেই এই মানবের লোকালয়ে বাজিয়া উঠেছি সুখে দুখে লাজে ভয়ে, গরজি ছুটিয়া ধাই জয়ে পরাজয়ে বিপুল ছন্দে উদার মন্দ্রে মাতিয়া। যে গন্ধ কাঁপে ফুলের বুকের কাছে, ভোরের আলোকে যে গান ঘুমায়ে আছে, শারদ-ধান্যে যে আভা আভাসে নাচে কিরণে কিরণে হসিত হিরণে হরিতে, সেই গন্ধই গড়েছে আমার কায়া, সে গান আমাতে রচিছে নূতন মায়া, সে আভা আমার নয়নে ফেলেছে ছায়া-- আমার মাঝারে আমারে কে পারে ধরিতে। নর-অরণ্যে মর্মতান তুলি, যৌবনবনে উড়াই কুসুমধূলি, চিত্তগুহায় সুপ্ত রাগিণীগুলি, শিহরিয়া উঠে আমার পরশে জাগিয়া। নবীন উষার তরুণ অরুণে থাকি গগনের কোণে মেলি পুলকিত আঁখি, নীরব প্রদোষে করুণ কিরণে ঢাকি থাকি মানবের হৃদয়চূড়ায় লাগিয়া। তোমাদের চোখে অঁখিজল ঝরে যবে আমি তাহাদের গেঁথে দিই গীতরবে, লাজুক হৃদয় যে কথাটি নাহি কবে সুরের ভিতরে লুকাইয়া কহি তাহারে। নাহি জানি আমি কী পাখা লইয়া উড়ি, খেলাই ভুলাই দুলাই ফুটাই কুঁড়ি, কোথা হতে কোন্ গন্ধ যে করি চুরি সন্ধান তার বলিতে পারি না কাহারে। যে আমি স্বপন-মুরতি গোপনচারী, যে আমি আমারে বুঝিতে বুঝাতে নারি, আপন গানের কাছেতে আপনি হারি, সেই আমি কবি। কে পারে আমারে ধরিতে। মানুষ-আকারে বদ্ধ যে জন ঘরে, ভূমিতে লুটায় প্রতি নিমেষের ভরে, যাহারে কাঁপায় স্তুতিনিন্দার জ্বরে, কবিরে পাবে না তাহার জীবনচরিতে।
হালকা আমার স্বভাব, মেঘের মতো না হোক গিরিনদীর মতো। আমার মধ্যে হাসির কলরব আজও থামল না। বেদীর থেকে নেমে আসি, রঙ্গমঞ্চে বসে বাঁধি নাচের গান, তার বায়না নিয়েছি প্রভুর কাছে। কবিতা লিখি, তার পদে পদে ছন্দের ভঙ্গিমায় তারুণ্য ওঠে মুখর হয়ে, ঝিঁঝিট খাম্বাজের ঝংকার দিতে আজো সে সংকোচ করে না। আমি সৃষ্টিকর্তা পিতামহের রহস্য-সখা। তিনি অর্বাচীন নবীনদের কাছে প্রবীণ বয়সের প্রমাণ দিতে ভুলেই গেছেন। তরুণের উচ্ছৃঙ্খল হাসিতে উতরোল তাঁর কৌতুক, তাদের উদ্দাম নৃত্যে বাজান তিনি দ্রুততালের মৃদঙ্গ। তাঁর বজ্রমন্দিত গাম্ভীর্য মেঘমেদুর অম্বরে, অজস্র তাঁর পরিহাস বিকশিত কাশবনে, শরতের অকারণ হাস্যহিল্লোলে। তাঁর কোনো লোভ নেই প্রধানদের কাছে মর্যাদা পাবার; তাড়াতাড়ি কালো পাথর চাপা দেন না চাপল্যের ঝরনার মুখে। তাঁর বেলাভূমিতে ভঙ্গুর সৈকতের ছেলেমানুষি প্রতিবাদ করে না সমুদ্রের। আমাকে চান টেনে রাখতে তাঁর বয়স্যদলে, তাই আমার বার্ধক্যের শিরোপা হঠাৎ নেন কেড়ে ফেলে দেন ধুলোয়-- তার উপর দিয়ে নেচে নেচে চলে যায় বৈরাগী পাঁচ রঙের তালি-দেওয়া আলখাল্লা পরে। যারা আমার মূল্য বাড়াতে চায়, পরায় আমাকে দামি সাজ, তাদের দিকে চেয়ে তিনি ওঠেন হেসে, ও সাজ আর টিঁকতে পায় না আনমনার অনবধানে। আমাকে তিনি চেয়েছেন নিজের অবারিত মজলিসে, তাই ভেবেছি যাবার বেলায় যাব মান খুইয়ে, কপালের তিলক মুছে, কৌতুকে রসোল্লাসে। এস আমার অমানী বন্ধুরা মন্দিরা বাজিয়ে-- তোমাদের ধুলোমাখা পায়ে যদি ঘুঙুর বাঁধা থাকে লজ্জা পাব না।