ভাগ্যে আমি পথ হারালেম কাজের পথে। নইলে অভাবিতের দেখা ঘটত না তো কোনোমতে। এই কোণে মোর ছিল বাসা, এইখানে মোর যাওয়া-আসা, সূর্য উঠে অস্তে মিলায় এই রাঙা পর্বতে, প্রতিদিনের ভার বহে যাই এই কাজেরই পথে। জেনেছিলুম কিছুই আমার নাই অজানা। যেখানে যা পাবার আছে জানি সবার ঠিক-ঠিকানা। ফসল নিয়ে গেছি হাটে ধেনুর পিছে গেছি মাঠে, বর্ষা-নদী পার করেছি খেয়ার তরীখানা। পথে পথে দিন গিয়েছে, সকল পথই জানা। সেদিন আমি জেগেছিলেম দেখে কারে? পসরা মোর পূর্ণ ছিল চলেছিলেম রাজার দ্বারে। সেদিন সবাই ছিল কাজে গোঠের মাঝে মাঠের মাঝে, ধরা সেদিন ভরা ছিল পাকা ধানের ভারে। ভোরের বেলা জেগেছিলেম দেখেছিলেম কারে। সেদিন চলে যেতে যেতে চমক লাগে। মনে হল বনের কোণে হাওয়াতে কার গন্ধ জাগে। পথের বাঁকে বটের ছায়ে গেল কে যে চপল-পায়ে চকিতে মোর নয়ন দুটি ভরিয়ে অরুণ-রাগে। সেদিন চলে যেতে যেতে মনে হল কেমন লাগে। এত দিনের পথ হারালেম এক নিমেষে; জানি নে তো কোথায় এলেম একটু পথের বাইরে এসে। দিনের পরে কেটেছে দিন পথে পথে বিরামহীন। জানি নে তো চলেছিলেম হেন অচিন দেশে। চিরকালের জানাশোনা ঘুচল এক নিমেষে। রইল পড়ে পসরা মোর পথের পাশে। চারি দিকের আকাশ আজি দিক্-ভোলানো হাসি হাসে। সকল-জানার বুকের মাঝে দাঁড়িয়েছিল অজানা যে তাই দেখে আজ বেলা গেল নয়ন ভ'রে আসে। পসরা মোর পাসরিলাম রইল পথের পাশে।
দেহে মনে সুপ্তি যবে করে ভর সহসা চৈতন্যলোকে আনে কল্পান্তর, জাগ্রত জগৎ চলে যায় মিথ্যার কোঠায়। তখন নিদ্রার শূন্য ভরি স্বপ্নসৃষ্টি শুরু হয়, ধ্রুব সত্য তারে মনে করি। সেও ভেঙে যায় যবে পুনর্বার জেগে উঠি অন্য এক ভবে; তখনি তাহারে সত্য বলি, নিশ্চিত স্বপ্নের রূপ অনিশ্চিতে কোথা যায় চলি। তাই ভাবি মনে যদি এ জীবন মোর গাঁথা থাকে মায়ার স্বপনে, মৃত্যুর আঘাতে জেগে উঠে অজিকার এ জগৎ অকস্মাৎ যায় টুটে, সব-কিছু অন্য-এক অর্থে দেখি-- চিত্ত মোর চমকিয়া সত্য বলি তারে জানিবে কি? সহসা কি উদিবে স্মরণে ইহাই জাগ্রত সত্য অন্যকালে ছিল তার মনে?
"কে নিবি গো কিনে আমায়, কে নিবি গো কিনে?" পসরা মোর হেঁকে হেঁকে বেড়াই রাতে দিনে। এমনি কবে হায়, আমার দিন যে চলে যায়, মায়ার 'পরে বোঝা আমার বিষম হল দায়। কেউ বা আসে, কেউ বা হাসে, কেউ বা কেঁদে চায়। মধ্যদিনে বেড়াই রাজার পাষাণ-বাঁধা পথে, মুকুট-মাথে অস্ত্র-হাতে রাজা এল রথে। বললে হাতে ধরে, "তোমায় কিনব আমি জোরে।" জোর যা ছিল ফুরিয়ে গেল টানাটানি করে। মুকুট-মাথে ফিরল রাজা সোনার রথে চড়ে। রুদ্ধ্ব দ্বারের সমুখ দিয়ে ফিরতেছিলেম গলি। দুয়ার খুলে বৃদ্ধ এল হাতে টাকার থলি। করলে বিবেচনা, বললে, "কিনব দিয়ে সোনা।" উজাড় করে দিয়ে থলি করলে আনাগোনা। বোঝা মাথায় নিয়ে কোথায় গেলেম অন্যমনা। সন্ধ্যাবেলায় জ্যোৎস্না নামে মুকুল-ভরা গাছে। সুন্দরী সে বেরিয়ে এল বকুলতলার কাছে। বললে কাছে এসে, "তোমায় কিনব আমি হেসে।" হাসিখানি চোখের জলে মিলিয়ে এল শেষে; ধীরে ধীরে ফিরে গেল বনছায়ার দেশে। সাগরতীরে রোদ পড়েছে ঢেউ দিয়েছে জলে, ঝিনুক নিয়ে খেলে শিশু বালুতটের তলে। যেন আমায় চিনে বললে, "অমনি নেব কিনে।" বোঝা আমার খালাস হল তখনি সেইদিনে। খেলার মুখে বিনামূল্যে নিল আমায় জিনে।