এ কথা স্মরণে রাখা কেন গো কঠিন তুমি আছ সব চেয়ে, আছ নিশিদিন, আছ প্রতি ক্ষণে--আছ দূরে, আছ কাছে, যাহা-কিছু আছে, তুমি আছ ব'লে আছে। যেমনি প্রবেশ আমি করি লোকালয়ে, যখনি মানুষ আসে স্তুতিনিন্দা লয়ে-- লয়ে রাগ, লয়ে দ্বেষ, লয়ে গর্ব তার অমনি সংসার ধরে পর্বত-আকার আবরিয়া ঊর্ধ্বলোক; তরঙ্গিয়া উঠে লাভজয় লোভক্ষোভ; নরের মুকুটে যে হীরক জ্বলে তারি আলোক-ঝলকে অন্য আলো নাহি হেরি দ্যুলোকে ভূলোকে। মানুষ সম্মুখে এলে কেন সেই ক্ষণে তোমার সম্মুখে আছি নাহি পড়ে মনে?
আমার মনে একটুও নেই বৈকুন্ঠের আশা।-- ওইখানে মোর বাসা যে মাটিতে শিউরে ওঠে ঘাস, যার 'পরে ওই মন্ত্র পড়ে দক্ষিনে বাতাস। চিরদিনের আলোক-জ্বালা নীল আকাশের নীচে যাত্রা আমার নৃত্যপাগল নটরাজের পিছে। ফুল ফোটাবার যে রাগিণী বকুল শাখায় সাধা, নিষ্কারণে ওড়ার আবেগ চিলের পাখায় বাঁধা, সেই দিয়েছে রক্তে আমার ঢেউয়ের দোলাদুলি; স্বপ্নলোকে সেই উড়েছে সুরের পাখনা তুলি। দায়-ভোলা মোর মন মন্দে-ভালোয় সাদায়-কালোয় অঙ্কিত প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে গেছে দূর দিগন্ত-পানে আপন বাঁশির পথ-ভোলানো তানে। দেখা দিল দেহের অতীত কোন্ দেহ এই মোর ছিন্ন করি বস্তুবাঁধন-ডোর। শুধু কেবল বিপুল অনুভূতি, গভীর হতে বিচ্ছুরিত আনন্দময় দ্যুতি, শুধু কেবল গানেই ভাষা যার, পুষ্পিত ফাল্গুনের ছন্দে গন্ধে একাকার; নিমেষহারা চেয়ে-থাকার দূর অপারের মাঝে ইঙ্গিত যার বাজে। যে দেহেতে মিলিয়ে আছে অনেক ভোরের আলো, নাম-না-জানা অপূর্বেরে যার লেগেছে ভালো, যে দেহেতে রূপ নিয়েছে অনির্বচনীয় সকল প্রিয়ের মাঝখানে যে প্রিয়, পেরিয়ে মরণ সে মোর সঙ্গে যাবে-- কেবল রসে, কেবল সুরে, কেবল অনুভাবে।