অলস মনের আকাশেতে প্রদোষ যখন নামে, কর্মরথের ঘড়্ঘড়ানি যে-মুহূর্তে থামে, এলোমেলো ছিন্নচেতন টুকরো কথার ঝাঁক জানি নে কোন্ স্বপ্নরাজের শুনতে যে পায় ডাক, ছেড়ে আসে কোথা থেকে দিনের বেলার গর্ত-- কারো আছে ভাবের আভাস কারো বা নেই অর্থ-- ঘোলা মনের এই যে সৃষ্টি, আপন অনিয়মে ঝিঁঝির ডাকে অকারণের আসর তাহার জমে। একটুখানি দীপের আলো শিখা যখন কাঁপায় চার দিকে তার হঠাৎ এসে কথার ফড়িং ঝাঁপায়। পষ্ট আলোর সৃষ্টি-পানে যখন চেয়ে দেখি মনের মধ্যে সন্দেহ হয় হঠাৎ মাতন এ কি। বাইরে থেকে দেখি একটা নিয়ম-ঘেরা মানে, ভিতরে তার রহস্য কী কেউ তা নাহি জানে। খেয়াল-স্রোতের ধারায় কী সব ডুবছে এবং ভাসছে-- ওরা কী-যে দেয় না জবাব, কোথা থেকে আসছে। আছে ওরা এই তো জানি, বাকিটা সব আঁধার-- চলছে খেলা একের সঙ্গে আর-একটাকে বাঁধার। বাঁধনটাকেই অর্থ বলি, বাঁধন ছিঁড়লে তারা কেবল পাগল বস্তুর দল শূন্যেতে দিক্হারা।
গীতাঞ্জলির গানগুলি ইংরেজি গদ্যে অনুবাদ করেছিলেম। এই অনুবাদ কাব্যশ্রেণীতে গণ্য হয়েছে। সেই অবধি আমার মনে এই প্রশ্ন ছিল যে, পদ্যছন্দের সুস্পষ্ট ঝংকার না রেখে ইংরেজিরই মতো বাংলা গদ্যে কবিতার রস দেওয়া যায় কি না। মনে আছে সত্যেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেম, তিনি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, চেষ্টা করেন নি। তখন আমি নিজেই পরীক্ষা করেছি, ‘লিপিকা’র অল্প কয়েকটি লেখায় সেগুলি আছে। ছাপবার সময় বাক্যগুলিকে পদ্যের মতো খণ্ডিত করা হয় নি-- বোধ করি ভীরুতাই তার কারণ। তার পরে আমার অনুরোধক্রমে একবার অবনীন্দ্রনাথ এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আমার মত এই যে, তাঁর লেখাগুলি কাব্যের সীমার মধ্যে এসেছিল, কেবল ভাষাবাহুল্যের জন্য তাতে পরিমাণ রক্ষা হয় নি। আর-একবার আমি সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছি।