তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই-পহর-- সূর্য তখন মাঝ-গগনে, রৌদ্র খরতর। ঘরের কর্ম সাঙ্গ করে ছিলেম তখন একলা ঘরে, আপন-মনে বসে ছিলেম বাতায়নের 'পর। তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই-পহর। চৈত্র মাসের নানা খেতের নানা গন্ধ নিয়ে আসতেছিল তপ্ত হাওয়া মুক্ত দুয়ার দিয়ে। দুটি ঘুঘু সারাটা দিন ডাকতেছিল শ্রান্তিবিহীন, একটি ভ্রমর ফিরতেছিল কেবল গুন্গুনিয়ে চৈত্র মাসের নানা খেতের নানা বার্তা নিয়ে। তখন পথে লোক ছিল না, ক্লান্ত কাতর গ্রাম। ঝাউশাখাতে উঠতেছিল শব্দ অবিশ্রাম। আমি শুধু একলা প্রাণে অতি সুদূর বাঁশির তানে গেঁথেছিলেম আকাশ ভ'রে একটি কাহার নাম। তখন পথে লোক ছিল না, ক্লান্ত কাতর গ্রাম। ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া, আমি ছিলেম জেগে-- আবাঁধা চুল উড়তে ছিল উদাস হাওয়া লেগে। তটতরুর ছায়ার তলে ঢেউ ছিল না নদীর জলে, তপ্ত আকাশ এলিয়ে ছিল শুভ্র অলস মেঘে। ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া, আমি ছিলেম জেগে। তুমি যখন চলে গেলে তখন দুই-পহর, শুষ্ক পথে দগ্ধ মাঠে রৌদ্র খরতর। নিবিড়-ছায়া বটের শাখে কপোত দুটি কেবল ডাকে একলা আমি বাতায়নে-- শূন্য শয়ন-ঘর। তুমি যখন গেলে তখন বেলা দুই-পহর।
নাম রেখেছি কোমল গান্ধার, মনে মনে। যদি তার কানে যেত অবাক হয়ে থাকত বসে, বলত হেসে "মানে কী'। মানে কিছুই যায় না বোঝা সেই মানেটাই খাঁটি। কাজ আছে কর্ম আছে সংসারে, ভালো মন্দ অনেক রকম আছে-- তাই নিয়ে তার মোটামুটি সবার সঙ্গে চেনাশোনা। পাশের থেকে আমি দেখি বসে বসে কেমন একটি সুর দিয়েছে চার দিকে। আপনাকে ও আপনি জানে না। যেখানে ওর অন্তর্যামীর আসন পাতা সেইখানে তাঁর পায়ের কাছে রয়েছে কোন্ ব্যথা-ধূপের পাত্রখানি। সেখান থেকে ধোঁয়ার আভাস চোখের উপর পড়ে, চাঁদের উপর মেঘের মতো-- হাসিকে দেয় একটুখানি ঢেকে। গলার সুরে কী করুণা লাগে ঝাপসা হয়ে। ওর জীবনের তানপুরা যে ওই সুরেতেই বাঁধা, সেই কথাটি ও জানে না। চলায় বলায় সব কাজেতেই ভৈরবী দেয় তান কেন যে তার পাই নে কিনারা। তাই তো আমি নাম দিয়েছি কোমল গান্ধার-- যায় না বোঝা যখন চক্ষু তোলে বুকের মধ্যে অমন ক'রে কেন লাগায় চোখের জলের মিড়।