আকাশের দূরত্ব যে, চোখে তারে দূর বলে জানি, মনে তারে দূর নাহি মানি। কালের দূরত্ব সেও যত কেন হোক-না নিষ্ঠুর তবু সে দুঃসহ নহে দূর। আঁধারের দূরত্বই কাছে থেকে রচে ব্যবধান, চেতনা আবিল করে, তার হাতে নাই পরিত্রাণ শুধু এই মাত্র নয়-- সে-যে সৃষ্টি করে নিত্যভয়। ছায়া দিয়ে রচি তুলে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ উপছায়া, জানারে অজানা করে--ঘেরে তারে অর্থহীনা মায়া। পথ লুপ্ত করে দিয়ে যে পথের করে সে নির্দেশ নাই তার শেষ। সে পথ ভুলায়ে লয় দিনে দিনে দূর হতে দূরে ধ্রুবতারাহীন অন্ধপুরে। অগ্নিবীণা বিস্তারিয়া যে প্রলয় আনে মহাকাল, চন্দ্রসূর্য লুপ্ত করে আবর্তে-ঘূর্ণিত জটাজাল, দিব্য দীপ্তিচ্ছটায় সে সাজে, বজ্রের ঝঞ্ঝনামন্দ্রে বক্ষে তার রুদ্রবীণা বাজে। যে বিশ্বে বেদনা হানে তাহারি দাহনে করে তার পবিত্র সৎকার। জীর্ণ জগতের ভস্ম যুগান্তের প্রচণ্ড নিশ্বাসে লুপ্ত হয় ঝঞ্ঝার বাতাসে। অবশেষে তপস্বীর তপস্যাবহ্নির শিখা হতে নবসৃষ্টি উঠে আসে নিরঞ্জন নবীন আলোতে। দানব বিলুপ্তি আনে, আঁধারের পঙ্কিল বুদ্বুদে নিখিলের সৃষ্টি দেয় মুদে; কণ্ঠ দেয় রূদ্ধ করি, বাণী হতে ছিন্ন করে সুর, ভাষা হতে অর্থ করে দূর; উদয়দিগন্তমুখে চাপা দেয় ঘন কালো আঁখি, প্রেমেরে সে ফেলে বাঁধি সংশয়ের ডোরে; ভক্তিপাত্র শূন্য করি শ্রদ্ধার অমৃত লয় হরে। মূক অন্ধ মৃত্তিকার স্তর, জগদ্দল শিলা দিয়ে রচে সেথা মুক্তির কবর।
মন্ত্রেসে যে পূত রাখীররাঙা সুতো বাঁধন দিয়েছিনু হাতে, আজ কিআছে সেটি সাথে। বিদায়বেলা এল মেঘের মতো ব্যেপে, গ্রন্থি বেঁধে দিতে দু হাত গেল কেঁপে, সেদিন থেকে থেকে চক্ষুদুটি ছেপে ভরে যে এল জলধারা। আজকে বসে আছি পথের এক পাশে, আমের ঘন বোলে বিভোল মধুমাসে তুচ্ছ কথাটুকু কেবল মনে আসে ভ্রমর যেন পথহারা-- সেই-যে বাম হাতে একটি সরু রাখী-- আধেক রাঙা, সোনা আধা, আজো কি আছে সেটি বাঁধা। পথ যে কতখানি কিছুই নাহি জানি, মাঠের গেছে কোন্ শেষে চৈত্র-ফসলের দেশে। যখন গেলে চলে তোমার গ্রীবামূলে দীর্ঘ বেণী তব এলিয়ে ছিল খুলে, মাল্যখানি গাঁথা সাঁজের কোন্ ফুলে লুটিয়ে পড়েছিল পায়ে। একটুখানি তুমি দাঁড়িয়ে যদি যেতে! নতুন ফুলে দেখো কানন ওঠে মেতে, দিতেম ত্বরা করে নবীন মালা গেঁথে কনকচাঁপা-বনছায়ে। মাঠের পথে যেতে তোমার মালাখানি প'ল কি বেণী হতে খসে আজকে ভাবি তাই বসে। নূপুর ছিল ঘরে গিয়েছ পায়ে প'রে-- নিয়েছ হেথা হতে তাই, অঙ্গে আর কিছু নাই। আকুল কলতানে শতেক রসনায় চরণ ঘেরি তব কাঁদিছে করুণায়, তাহারা হেথাকার বিরহবেদনায় মুখর করে তব পথ। জানি না কী এত যে তোমার ছিল ত্বরা, কিছুতে হল না যে মাথার ভূষা পরা, দিতেম খুঁজে এনে সিঁথিটি মনোহরা-- রহিল মনে মনোরথ। হেলায়-বাঁধা সেই নূপুর-দুটি পায়ে আছে কি পথে গেছে খুলে সে কথা ভাবি তরুমূলে। অনেক গীতগান করেছি অবসান অনেক সকালে ও সাঁজে অনেক অবসরে কাজে। তাহারি শেষ গান আধেক লয়ে কানে দীর্ঘ পথ দিয়ে গেছ সুদূর-পানে, আধেক-জানা সুরে আধেক-ভোলা তানে গেয়েছ গুন্ গুন্ স্বরে। কেন না গেলে শুনি একটি গান আরো-- সে গান শুধু তব, সে নহে আর কারো-- তুমিও গেলে চলে সময় হল তারো, ফুটল তব পূজাতরে। মাঠের কোন্খানে হারালো শেষ সুর যে গান নিয়ে গেল শেষে, ভাবি যে তাই অনিমেষে।