নারীর দুখের দশা অপমানে জড়ানো এই দেখি দিকে দিকে ঘরে ঘরে ছড়ানো। জানো কি এ অন্যায় সমাজের হিসাবে নিমেষে নিমেষে কত হলাহল মিশাবে? পুরুষ জেনেছে এটা বিধিনির্দিষ্ট তাদের জীবন-ভোজে নারী উচ্ছিষ্ট। রোগ-তাপে সেবা পায়, লয় তাহা অলসে-- সুধা কেন ঢালে বিধি ছিদ্র এ কলসে! সমসম্মান হেথা নাহি মানে পুরুষে, নিজ প্রভুপদমদে তুলে রয় ভুরু সে। অর্ধেক কাপুরুষ অর্ধেক রমণী তাতেই তো নাড়ীছাড়া এ দেশের ধমণী। বুঝিতে পারে না ওরা-- এ বিধানে ক্ষতি কার। জানি না কী বিপ্লবে হবে এর প্রতিকার। একদা পুরুষ যদি পাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়ে নারীর পাশে নাহি নামে যুদ্ধে অর্ধেক-কালি-মাখা সমাজের বুকটা খাবে তবে বারে বারে শনির চাবুকটা। এত কথা বৃথা বলা--যে পেয়েছে ক্ষমতা নিঃসহায়ের প্রতি নাই তার মমতা, আপনার পৌরুষ করি দিয়া লাঞ্ছিত অবিচার করাটাই হয় তার বাঞ্ছিত।
শ্লথপ্রাণ দুর্বলের স্পর্ধা আমি কভু সহিব না। লোলুপ সে লালায়িত, প্রেমেরে সে করে বিড়ম্বনা ক্লেদঘন চাটুবাক্যে, বাষ্পে বিজড়িত দৃষ্টি তার কলুষকুণ্ঠিত অঙ্গে লিপ্ত করে গ্লানি লালসার, আবেশে মন্থর কণ্ঠে গদ্গদ সে প্রার্থনা জানায় আলোকবঞ্চিত তার অন্তরের কানায় কানায় দুষ্ট ফেন উঠে বুদ্বুদিয়া-- ফেটে যায়, দেয় খুলি রুদ্ধ বিষবায়ু। গলিত মাংসের যেন ক্রিমিগুলি কল্পনাবিকার তার শিথিল চিন্তার তলে তলে আকুলিতে থাকে কিলিবিলি।-- যেন প্রাণপণ বলে মন তারে করে কষাঘাত! জীর্ণমজ্জা কাপুরুষে নারী যদি গ্রাহ্য করে, লজ্জিত দেবতা তারে দুষে অসহ্য সে অপমানে। নারী সে-যে মহেন্দ্রের দান, এসেছে ধরিত্রীতলে পুরুষেরে সঁপিতে সম্মান।
আমার ঘরের আশেপাশে যে-সব আমার বোবা-বন্ধু আলোর প্রেমে মত্ত হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে তাদের ডাক আমার মনের মধ্যে পৌঁছল। তাদের ভাষা হচ্ছে জীবজগতের আদিভাষা, তার ইশারা গিয়ে পোঁছয় প্রাণের প্রথমতম স্তরে; হাজার হাজার বৎসরের ভুলে-যাওয়া ইতিহাসকে নাড়া দেয়; মনের মধ্যে যে-সাড়া ওঠে সেও ঐ গাছের ভাষায়-- তার কোনো স্পষ্ট মানে নেই, অথচ তার মধ্যে বহু যুগযুগান্তর গুনগুনিয়ে ওঠে। ঐ গাছগুলো বিশ্ববাউলের একতারা, ওদের মজ্জায় মজ্জায় সরল সুরের কাঁপন, ওদের ডালে ডালে পাতায় পাতায় একতালা ছন্দের নাচন। যদি নিস্তব্ধ হয়ে প্রাণ দিয়ে শুনি তা হলে অন্তরের মধ্যে মুক্তির বাণী এসে লাগে। মুক্তি সেই বিরাট প্রাণসমুদ্রের কূলে, যে-সমুদ্রের উপরের তলায় সুন্দরের লীলা রঙে রঙে তরঙ্গিত, আর গভীরতলে "শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্'। সেই সুন্দরের লীলায় লালসা নেই, আবেশ নেই, জড়তা নেই, কেবল পরমা শক্তির নিঃশেষ আনন্দের আন্দোলন। "এতস্যৈবানন্দস্য মাত্রাণি' দেখি ফুলে ফলে পল্লবে; তাতেই মুক্তির স্বাদ পাই, বিশ্বব্যাপী প্রাণের সঙ্গে প্রাণের নির্মল অবাধ মিলনের বাণী শুনি।