বিশ্বজগৎ যখন করে কাজ স্পর্ধা ক'রে পরে ছুটির সাজ। আকাশে তার আলোর ঘোড়া চলে, কৃতিত্বেরে লুকিয়ে রাখে পরিহাসের ছলে। বনের তলে গাছে গাছে শ্যামল রূপের মেলা, ফুলে ফলে নানান্ রঙে নিত্য নতুন খেলা। বাহির হতে কে জানতে পায়, শান্ত আকাশতলে প্রাণ বাঁচাবার কঠিন কর্মে নিত্য লড়াই চলে। চেষ্টা যখন নগ্ন হয়ে শাখায় পড়ে ধরা, তখন খেলার রূপ চলে যায়, তখন আসে জরা। বিলাসী নয় মেঘগুলো তো জলের ভারে ভরা, চেহারা তার বিলাসিতার রঙের ভূষণ পরা। বাইরে ওরা বুড়োমিকে দেয় না তো প্রশ্রয়-- অন্তরে তাই চিরন্তনের বজ্রমন্দ্র রয়। জল-ঝরানো ছেলেখেলা যেমনি বন্ধ করে ফ্যাকাশে হয় চেহারা তার, বয়স তাকে ধরে। দেহের মাঝে হাজার কাজে বহে প্রাণের বায়ু-- পালের তরীর মতন যেন ছুটিয়ে চলে আয়ু, বুকের মধ্যে জাগায় নাচন, কণ্ঠে লাগায় সুর, সকল অঙ্গ অকারণে উৎসাহে ভরপুর। রক্তে যখন ফুরোবে ওর খেলার নেশা খোঁজা তখনি কাজ অচল হবে, বয়স হবে বোঝা। ওগো তুমি কী করছ, ভাই, স্তব্ধ সারাক্ষণ-- বুদ্ধি তোমার আড়ষ্ট যে, ঝিমিয়ে-পড়া মন। নবীন বয়স যেই পেরোল খেলাঘরের দ্বারে মরচে-পড়া লাগল তালা, বন্ধ একেবারে। ভালোমন্দ বিচারগুলো খোঁটায় যেন পোঁতা। আপন মনের তলায় তুমি তলিয়ে গেলে কোথা। চলার পথে আগল দিয়ে বসে আছ স্থির-- বাইরে এসো, বাইরে এসো, পরমগম্ভীর। কেবলই কি প্রবীণ তুমি, নবীন নও কি তাও। দিনে দিনে ছি ছি কেবল বুড়ো হয়েই যাও। আশি বছর বয়স হবে ওই যে পিপুলগাছ, এ আশ্বিনের রোদ্দুরে ওর দেখলে বিপুল নাচ? পাতায় পাতায় আবোল-তাবোল, শাখায় দোলাদুলি, পান্থ হাওয়ার সঙ্গে ও চায় করতে কোলাকুলি। ওগো প্রবীণ, চলো এবার সকল কাজের শেষে নবীন হাসি মুখে নিয়ে চরম খেলার বেশে।
অবকাশ ঘোরতর অল্প, অতএব কবে লিখি গল্প! সময়টা বিনা কাজে ন্যস্ত, তা নিয়েই সর্বদা ব্যস্ত। তাই ছেড়ে দিতে হল শেষটা কলমের ব্যবহার-চেষ্টা। সারাবেলা চেয়ে থাকি শূন্যে, বুঝি গতজন্মের পুণ্যে পায় মোর উদাসীন চিত্ত রূপে রূপে অরূপের বিত্ত। নাই তার সঞ্চয়তৃষ্ণা, নষ্ট করাতে তার নিষ্ঠা। মৌমাছি-স্বভাবটা পায় নাই, ভবিষ্যতের কোনো দায় নাই। ভ্রমর যেমন মধু নিচ্ছে যখন যেমন তার ইচ্ছে। অকিঞ্চনের মতো কুঞ্জে নিত্য আলসরস ভুঞ্জে। মৌচাক রচে না কী জন্যে-- ব্যর্থ বলিয়া তারে অন্যে গাল দিক, খেদ নাই তা নিয়ে। জীবনটা চলেছে সে বানিয়ে আলোতে বাতাসে আর গন্ধে আপন পাখা-নাড়ার ছন্দে। জগতের উপকার করতে চায় না সে প্রাণপণে মরতে, কিম্বা সে নিজের শ্রীবৃদ্ধির টিকি দেখিল না আজও সিদ্ধির। কভু যার পায় নাই তত্ত্ব তারি গুণগান নিয়ে মত্ত। যাহা-কিছু হয় নাই পষ্ট, যা দিয়েছে না-পাওয়ার কষ্ট, যা রয়েছে অভ্যাসের বস্তু, তারেই সে বলিয়াছে "অস্তু' যাহা নহে গণনায় গণ্য তারি রসে হয়েছে সে ধন্য। তবে কেন চাও তারে আনতে পাব্লিশরের চক্রান্তে। যে রবি চলেছে আজ অস্তে দেবে সমালোচকের হস্তে? বসে আছি, প্রলয়ের পথ-কার কবে করিবেন তার সৎকার। নিশীথিনী নেবে তারে বাহুতে, তার আগে খাবে কেন রাহুতে? কলমটা তবে আজ তোলা থাক্, স্তুতিনিন্দার দোলে দোলা থাক্। আজি শুধু ধরণীর স্পর্শ এনে দিক অন্তিম হর্ষ। বোবা তরুলতিকার বাক্য দিক তারে অসীমের সাক্ষ্য।