গীতাঞ্জলির গানগুলি ইংরেজি গদ্যে অনুবাদ করেছিলেম। এই অনুবাদ কাব্যশ্রেণীতে গণ্য হয়েছে। সেই অবধি আমার মনে এই প্রশ্ন ছিল যে, পদ্যছন্দের সুস্পষ্ট ঝংকার না রেখে ইংরেজিরই মতো বাংলা গদ্যে কবিতার রস দেওয়া যায় কি না। মনে আছে সত্যেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেম, তিনি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, চেষ্টা করেন নি। তখন আমি নিজেই পরীক্ষা করেছি, ‘লিপিকা’র অল্প কয়েকটি লেখায় সেগুলি আছে। ছাপবার সময় বাক্যগুলিকে পদ্যের মতো খণ্ডিত করা হয় নি-- বোধ করি ভীরুতাই তার কারণ। তার পরে আমার অনুরোধক্রমে একবার অবনীন্দ্রনাথ এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আমার মত এই যে, তাঁর লেখাগুলি কাব্যের সীমার মধ্যে এসেছিল, কেবল ভাষাবাহুল্যের জন্য তাতে পরিমাণ রক্ষা হয় নি। আর-একবার আমি সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছি।
পরজন্ম সত্য হলে কী ঘটে মোর সেটা জানি-- আবার আমায় টানবে ঘরে বাংলাদেশের এ রাজধানী। গদ্য পদ্য লিখনু ফেঁদে, তারাই আমায় আনবে বেঁধে, অনেক লেখায় অনেক পাতক, সে মহাপাপ করবে মোচন-- আমায় হয়তো করতে হবে আমার লেখা সমালোচন। ততদিনে দৈবে যদি পক্ষপাতী পাঠক থাকে কর্ণ হবে রক্তবর্ণ এমনি কটু বলব তাকে। যে বইখানি পড়বে হাতে দগ্ধ করব পাতে পাতে, আমার ভাগ্যে হব আমি দ্বিতীয় এক ধূম্রলোচন-- আমায় হয়তো করতে হবে আমার লেখা সমালোচন। বলব,"এ-সব কী পুরাতন! আগাগোড়া ঠেকছে চুরি। মনে হচ্ছে, আমিও এমন লিখতে পারি ঝুড়ি ঝুড়ি।' আরো যে-সব লিখব কথা ভাবতে মনে বাজছে ব্যথা, পরজন্মের নিষ্ঠুরতায় এ জন্মে হয় অনুশোচন-- আমায় হয়তো করতে হবে আমার লেখা সমালোচন। তোমরা, যাঁদের বাক্য হয় না আমার পক্ষে মুখরোচক তোমরা যদি পুনর্জন্মে হও পুনর্বার সমালোচক-- আমি আমায় পাড়ব গালি, তোমরা তখন ভাববে খালি কলম ক'ষে ব'সে ব'সে প্রতিবাদের প্রতি বচন। আমায় হয়তো করতে হবে আমার লেখা সমালোচন। লিখব, ইনি কবিসভায় হংসমধ্যে বকো যথা! তুমি লিখবে, কোন্ পাষণ্ড বলে এমন মিথ্যা কথা! আমি তোমায় বলব--মূঢ়, তুমি আমায় বলবে--রূঢ়, তার পরে যা লেখালেখি হবে না সে রুচিরোচন। তুমি লিখবে কড়া জবাব, আমি কড়া সমালোচন।