স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে, মনেও হয়নি তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা। তুমিও মূল্য করনি দাবি। দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত, দিলে ডালি উজাড় ক'রে। আড়চোখে চেয়ে আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে; পরদিনে মনে রইল না। নববসন্তের মাধবী যোগ দিয়েছিল তোমার দানের সঙ্গে, শরতের পূর্ণিমা দিয়েছিল তারে স্পর্শ। তোমার কালো চুলের বন্যায় আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে "তোমাকে যা দিই তোমার রাজকর তার চেয়ে অনেক বেশি; আরো দেওয়া হল না আরো যে আমার নেই।" বলতে বলতে তোমার চোখ এল ছলছলিয়ে। আজ তুমি গেছ চলে, দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত, তুমি আস না। এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে দেখছি তোমার রত্নমালা, নিয়েছি তুলে বুকে। যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা। তোমার প্রেমের দাম দেওয়া হল বেদনায়, হারিয়ে তাই পেলেম তোমায় পূর্ণ ক'রে।
বাঁশরি আনে আকাশ-বাণী- ধরণী আনমনে কিছু বা ভোলে কিছু বা আধো শোনে। নামিবে রবি অস্তপথে, গানের হবে শেষ-- তখন ফিরে ঘিরিবে তারে সুরের কিছু রেশ। অলস খনে কাঁপায় হাওয়া আধেকখানি-হারিয়ে-যাওয়া গুঞ্জরিত কথা, মিলিয়া প্রজাপতির সাথে রাঙিয়ে তোলে আলোছায়াতে দুইপহরে-রোদ-পোহানো গভীর নীরবতা। হল্দেরঙা-পাতায়-দোলা নাম-ভোলা ও বেদনা-ভোলা বিষাদ ছায়ারূপী ঘোমটা-পরা স্বপনময় দূরদিনের কী ভাষা কয় জানি না চুপিচুপি। জীবনে যারা স্মরণ-হারা তবু মরণ জানে না তারা, উদাসী তারা মর্মবাসী পড়ে না কভু চোখে-- প্রতিদিনের সুখ-দুখেরে অজানা হয়ে তারাই ঘেরে, বাষ্পছবি আঁকিয়া ফেরে প্রাণের মেঘলোকে।
পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা। সব শেষ হল যেখানে সেথায় তুমি আর আমি একা। নানা বসন্তে নানা বরষায় অনেক দিবসে অনেক নিশায় দেখেছি অনেক, সহেছি অনেক, লিখেছি অনেক লেখা-- পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা। কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে! পিছনে চাহিয়া দেখিনু কখন চলিয়া গিয়াছে সবে। তোমার নীরব নিভৃত ভবনে জানি না কখন পশিনু কেমনে। অবাক রহিনু আপন প্রাণের নূতন গানের রবে। কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে! চিহ্ন কি আছে শ্রান্ত নয়নে অশ্রুজলের রেখা? বিপুল পথের বিবিধ কাহিনী আছে কি ললাটে লেখা? রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন, বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন, তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে তুমি আর আমি একা। নয়নে আমার অশ্রুজলের চিহ্ন কি যায় দেখা!