দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে এসেছে আমার দ্বারে; একমাত্র অস্ত্র তার দেখেছিনু কষ্টের বিকৃত ভান, ত্রাসের বিকট ভঙ্গি যত অন্ধকার ছলনার ভূমিকা তাহার। যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়। এই হার-জিত খেলা, জীবনের মিথ্যা এ কুহক শিশুকাল হতে বিজড়িত পদে পদে এই বিভীষিকা, দুঃখের পরিহাসে ভরা। ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি-- মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে।
যখন বীণায় মোর আনমনা সুরে গান বেঁধেছিনু বসি একা তখনো যে ছিলে তুমি দূরে, দাও নাই দেখা; কেমনে জানিব, সেই গান অপরিচয়ের তীরে তোমারেই করিছে সন্ধান। দেখিলাম, কাছে তুমি আসিলে যেমনি তোমারি গতির তালে বাজে মোর এ ছন্দের ধ্বনি; মনে হল, সুরের সে মিলে উচ্ছ্বসিল আনন্দের নিশ্বাস নিখিলে। বর্ষে বর্ষে পুষ্পবনে পুষ্পগুলি ফুটে আর ঝরে এ মিলের তরে। কবির সংগীতে বাণী অঞ্জলি পাতিয়া আছে জাগি অনাগত প্রসাদের লাগি। চলে লুকাচুরি খেলা বিশ্বে অনিবার অজানার সাথে অজানার।
কেন চুপ করে আছি, কেন কথা নাই, শুধাইছ তাই। কথা দিয়ে ডেকে আনি যারে দেবতারে, বাহির দ্বারের কাছে এসে ফিরে যায় হেসে। মৌনের বিপুল শক্তিপাশে ধরা দিয়ে আপনে সে আসে আসে পরিপূর্ণতায় হৃদয়ের গভীর গুহায়। অধীর আহ্বানে রবাহূত প্রসাদের মূল্য হয় চ্যুত। স্বর্গ হতে বর, সেও আনে অসম্মান ভিক্ষার সমান। ক্ষুব্ধ বাণী যবে শান্ত হয়ে আসে দৈববাণী নামে সেই অবকাশে। নীরব আমার পূজা তাই, স্তবগান নাই; আর্দ্র স্বরে ঊর্ধ্বপানে চেয়ে নাহি ডাকে, স্তব্ধ হয়ে থাকে। হিমাদ্রিশিখরে নিত্য নীরবতা তার ব্যাপ্ত করি রহে চারি ধার; নির্লিপ্ত সে সুদূরতা বাক্যহীন বিশাল আহ্বান আকাশে আকাশে দেয় টান, মেঘপুঞ্জ কোথা থেকে অবারিত অভিষেকে অজস্র সহস্রধারে পুণ্য করে তারে। না-কওয়ার না-চাওয়ার সেই সাধনায় হয়ে লীন সার্থক শন্তিতে যাক দিন।