ওই যে সৌন্দর্য লাগি পাগল ভুবন, ফুটন্ত অধরপ্রান্তে হাসির বিলাস, গভীরতিমিরমগ্ন আঁখির কিরণ, লাবণ্যতরঙ্গভঙ্গ গতির উচ্ছ্বাস, যৌবনললিতলতা বাহুর বন্ধন, এরা তো তোমারে ঘিরে আছে অনুক্ষণ-- তুমি কি পেয়েছ নিজ সৌন্দর্য-আভাস? মধুরাতে ফুলপাতে করিয়া শয়ন বুঝিতে পার কি নিজ মধু-আলিঙ্গন? আপনার প্রস্ফুটিত তনুর উল্লাস আপনারে করেছে কি মোহ-নিমগন? তবে মোরা কী লাগিয়া করি হা-হুতাশ। দেখো শুধু ছায়াখানি মেলিয়া নয়ন; রূপ নাহি ধরা দেয়-- বৃথা সে প্রয়াস।
জাগার থেকে ঘুমোই, আবার ঘুমের থেকে জাগি,-- অনেক সময় ভাবি মনে কেন, কিসের লাগি? আমাকে, মা, যখন তুমি ঘুম পাড়িয়ে রাখ তখন তুমি হারিয়ে গিয়ে তবু হারাও নাকো। রাতে সূর্য, দিনে তারা পাই নে, হাজার খুঁজি। তখন তা'রা ঘুমের সূর্য, ঘুমের তারা বুঝি? শীতের দিনে কনকচাঁপা যায় না দেখা গাছে, ঘুমের মধ্যে নুকিয়ে থাকে নেই তবুও আছে। রাজকন্যে থাকে, আমার সিঁড়ির নিচের ঘরে। দাদা বলে, "দেখিয়ে দে তো।" বিশ্বাস না করে। কিন্তু, মা, তুই জানিস নে কি আমার সে রাজকন্যে ঘুমের তলায় তলিয়ে থাকে, দেখি নে সেইজন্যে। নেই তবুও আছে এমন নেই কি কত জিনিস? আমি তাদের অনেক জানি, তুই কি তাদের চিনিস? যেদিন তাদের রাত পোয়াবে উঠবে চক্ষু মেলি সেদিন তোমার ঘরে হবে বিষম ঠেলাঠেলি। নাপিত ভায়া, শেয়াল ভায়া, ব্যাঙ্গমা বেঙ্গুমী ভিড় ক'রে সব আসবে যখন কী যে করবে তুমি! তখন তুমি ঘুমিয়ে প'ড়ো, আমিই জেগে থেকে নানারকম খেলায় তাদের দেব ভুলিয়ে রেখে। তার পরে যেই জাগবে তুমি লাগবে তাদের ঘুম, তখন কোথাও কিচ্ছুই নেই সমস্ত নিজ্ঝুম।
আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে তখনকে তুমি তা কে জানত। তখন ছিল না ভয় ছিল না লাজ মনে জীবনবহে যেত অশান্ত। তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত যেন আমার আপন সখার মতো, হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলেম ছুটে সেদিন কত না বন-বনান্ত। ওগো সেদিন তুমি গাইতে যে-সব গান কোনো অর্থ তাহার কে জানত। শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ, সদা নাচত হৃদয় অশান্ত। হঠাৎ খেলার শেষে আজ কী দেখি ছবি, স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি, তোমার চরণপানে নয়ন করি' নত ভুবন দাঁড়িয়ে আছে একান্ত।