আজ ফুল ফুটেছে মোর আসনের ডাইনে বাঁয়ে; পূজার ছায়ে। ওরা মিশায় ওদের নীরব ক্লান্তি আমার গানে, আমার প্রাণে। ওরা নেয় তুলে মোর কণ্ঠ ওদের সকল গায়ে পূজার ছায়ে। হেথায় সাড়া পেল বাহির হল প্রভাত-রবি অমল-ছবি। সে যে আলোটি তার মিলিয়ে দিল আমার মাথে প্রণাম-সাথে। সে যে আমার চোখে দেখে নিল আমার মায়ে পূজার ছায়ে।
প্রাণ-ধারণের বোঝাখানা বাঁধা পিঠের 'পরে, আকাল পড়ল, দিন চলে না, চলল দেশান্তরে। দূর শহরে একটা কিছু যাবেই যাবে জুটে, এই আশাতেই লগ্ন দেখে ভোরবেলাতে উঠে দুর্গা ব'লে বুক বেঁধে সে চলল ভাগ্যজয়ে, মা ডাকে না পিছুর ডাকে অমঙ্গলের ভয়ে। স্ত্রী দাঁড়িয়ে দুয়ার ধরে দুচোখ শুধু মোছে, আজ সকালে জীবনটা তার কিছুতেই না রোচে। ছেলে গেছে জাম কুড়োতে দিঘির পাড়ে উঠি, মা তারে আজ ভুলে আছে তাই পেয়েছে ছুটি। স্ত্রী বলেছে বারে বারে, যে ক'রে হোক খেটে সংসারটা চালাবে সে, দিন যাবে তার কেটে। ঘর ছাইতে খড়ের আঁঠির জোগান দেবে সে যে, গোবর দিয়ে নিকিয়ে দেবে দেয়াল পাঁচিল মেঝে। মাঠের থেকে খড়কে কাঠি আনবে বেছে বেছে, ঝাঁটা বেঁধে কুমোরটুলির হাটে আসবে বেচে। ঢেঁকিতে ধান ভেনে দেবে বামুনদিদির ঘরে, খুদকুঁড়ো যা জুটবে তাতেই চলবে দুর্বছরে। দূর দেশেতে বসে বসে মিথ্যা অকারণে কোনোমতেই ভাব্না যেন না রয় স্বামীর মনে। সময় হল, ঐ তো এল খেয়াঘাটের মাঝি, দিন না যেতে রহিমগঞ্জে যেতেই হবে আজি। সেইখানেতে চৌকিদারি করে ওদের জ্ঞাতি, মহেশখুড়োর মেঝো জামাই, নিতাই দাসের নাতি। নতুন নতুন গাঁ পেরিয়ে অজানা এই পথে পৌঁছবে পাঁচদিনের পরে শহর কোনোমতে। সেইখানে কোন্ হালসিবাগান, ওদের গ্রামের কালো, শর্ষেতেলের দোকান সেথায় চালাচ্ছে খুব ভালো। গেলে সেথায় কালুর খবর সবাই বলে দেবে-- তারপরে সব সহজ হবে, কী হবে আর ভেবে। স্ত্রী বললে, "কালুদাকে খবরটা এই দিয়ো, ওদের গাঁয়ের বাদল পালের জাঠতুত ভাই প্রিয় বিয়ে করতে আসবে আমার ভাইঝি মল্লিকাকে উনত্রিশে বৈশাখে।"
দুঃসহ দুঃখের বেড়াজালে মানবেরে দেখি যবে নিরুপায়, ভাবিয়া না পাই মনে, সান্ত্বনা কোথায় আছে তার। আপনারি মূঢ়তায়, আপনারি রিপুর প্রশ্রয়ে এ দুঃখের মূল জানি; সে জানায় আশ্বাস না পাই। এ কথা যখন জানি, মানবচিত্তের সাধনায় গূঢ় আছে যে সত্যের রূপ সেই সত্য সুখ দুঃখ সবের অতীত তখন বুঝিতে পারি, আপন আত্মায় যারা ফলবান করে তারে তারাই চরম লক্ষ্য মানবসৃষ্টির; একমাত্র তারা আছে, আর কেহ নাই; আর যারা সবে মায়ার প্রবাহে তারা ছায়ার মতন-- দুঃখ তাহাদের সত্য নহে, সুখ তাহাদের বিড়ম্বনা, তাহাদের ক্ষতব্যথা দারুণ আকৃতি ধ'রে প্রতি ক্ষণে লুপ্ত হয়ে যায়, ইতিহাসে চিহ্ন নাহি রাখে।