নহে নহে এ মনে মরণ। সহসা এ প্রাণপূর্ণ নিশ্বাসবাতাস নীরবে করে যে পলায়ন, আলোতে ফুটায় আলো এই আঁখিতারা নিবে যায় একদা নিশীথে, বহে না রুধিরনদী, সুকোমল তনু ধূলায় মিলায় ধরণীতে, ভাবনা মিলায় শূন্যে, মৃত্তিকার তলে রুদ্ধ হয় অময় হৃদয়-- এই মৃত্যু? এ তো মৃত্যু নয়। কিন্তু রে পবিত্র শোক যায় না যে দিন পিরিতির স্মিরিতিমন্দিরে, উপেক্ষিত অতীতের সমাধির 'পরে তৃণরাজি দোলে ধীরে ধীরে, মরণ-অতীত চির-নূতন পরান স্মরণে করে না বিচরণ-- সেই বটে সেই তো মরণ!
বড়োর দলে নাইবা হলে গণ্য-- লোভ কোরো না লোকখ্যাতির জন্য। ভালোবাসো, ভালো করো, প্রাণ মনে হও ভালো-- তবেই তুমি আলো পাবে, তবেই দেবে আলো-- আপন-মাঝে আপনি হবে ধন্য। স্বার্থমাঝে থেকো না অবরুদ্ধ-- লোভের সাথে নিয়ত করো যুদ্ধ। নিজেরে যদি বিশ্বমাঝে করিতে পারো দান নিজেরে তবে করিবে লাভ-- তখনি পাবে ত্রাণ, হৃদয়ে মনে তখনি হবে শুদ্ধ। নদীর জলে প্রবাহ হলে বন্ধ তাহার দশা তখনি জেনো মন্দ। দানের স্রোতে ছিল যে তার নিয়ত ত্রাণধারা-- হারায়ে ফেলি আপনা দিয়ে রচে আপন কারা, অশুচি হয়ে রহে সে নিরানন্দ।
এই লেখনগুলি সুরু হয়েছিল চীনে জাপানে। পাখায় কাগজে রুমালে কিছু লিখে দেবার জন্যে লোকের অনুরোধে এর উৎপত্তি। তারপরে স্বদেশে ও অন্য দেশেও তাগিদ পেয়েছি। এমনি ক'রে এই টুকরো লেখাগুলি জমে উঠ্ল। এর প্রধান মূল্য হাতের অক্ষরে ব্যক্তিগত পরিচয়ের । সে পরিচয় কেবল অক্ষরে কেন, দ্রুতলিখিত ভাবের মধ্যেও ধরা পড়ে। ছাপার অক্ষরে সেই ব্যক্তিগত সংস্রবটি নষ্ট হয়-- সে অবস্থায় এই সব লেখা বাতি-নেবা চীন লণ্ঠনের মতো হাল্কা ও ব্যর্থ হতে পারে। তাই জর্ম্মনিতে হাতের অক্ষর ছাপবার উপায় আছে খবর পেয়ে লেখনগুলি ছাপিয়ে নেওয়া গেল। অন্যমনস্কতায় কাটাকুটি ভুলচুক ঘটেছে। সে সব ত্রুটিতেও ব্যক্তিগত পরিচয়েরই আভাস রয়ে গেল॥ শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর