বয়স তখন ছিল কাঁচা; হালকা দেহখানা ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা। উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলোর ঝাঁক, বারান্দাটার রেলিং-'পরে ডাকত এসে কাক। ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে, তপসিমাছের ঝুড়ি নিত গামছা দিয়ে ঢেকে। বেহালাটা হেলিয়ে কাঁধে ছাদের 'পরে দাদা, সন্ধ্যাতারার সুরে যেন সুর হত তাঁর সাধা। জুটেছি বৌদিদির কাছে ইংরেজি পাঠ ছেড়ে, মুখখানিতে-ঘের-দেওয়া তাঁর শাড়িটি লালপেড়ে। চুরি ক'রে চাবির গোছা লুকিয়ে ফুলের টবে স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে। কঙ্কালী চাটুজ্জে হঠাৎ জুটত সন্ধ্যা হলে; বাঁ হাতে তার থেলো হুঁকো, চাদর কাঁধে ঝোলে। দ্রুত লয়ে আউড়ে যেত লবকুশের ছড়া; থাকত আমার খাতা লেখা, পড়ে থাকত পড়া-- মনে মনে ইচ্ছে হত, যদিই কোনো ছলে ভর্তি হওয়া সহজ হত এই পাঁচালির দলে ভাব্না মাথায় চাপত নাকো ক্লাসে ওঠার দায়ে, গান শুনিয়ে চলে যেতুম নতুন নতুন গাঁয়ে। স্কুলের ছুটি হয়ে গেলে বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ দেখি, মেঘ নেমেছে ছাদের কাছে ঘেঁষে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, রাস্তা ভাসে জলে, ঐরাবতের শুঁড় দেখা দেয় জল-ঢালা সব নলে। অন্ধকারে শোনা যেত রিম্ঝিমিনি ধারা, রাজপুত্র তেপান্তরে কোথা সে পথহারা। ম্যাপে যে-সব পাহাড় জানি, জানি যে-সব গাঙ কুয়েন্লুন আর মিসিসিপি ইয়াংসিকিয়াং, জানার সঙ্গে আধেক-জানা, দূরের থেকে শোনা, নানা রঙের নানা সুতোয় সব দিয়ে জাল-বোনা, নানারকম ধ্বনির সঙ্গে নানান চলাফেরা সব দিয়ে এক হালকা জগৎ মন দিয়ে মোর ঘেরা, ভাব্নাগুলো তারই মধ্যে ফিরত থাকি থাকি, বানের জলে শ্যাওলা যেমন, মেঘের তলে পাখি।
তোমায় আমি দেখি নাকো, শুধু তোমার স্বপ্ন দেখি -- তুমি আমায় বারে বারে শুধাও, "ওগো, সত্য সে কি?' কী জানি গো, হয়তো বুঝি তোমার মাঝে কেবল খুঁজি এই জনমের রূপের তলে আর-জনমের ভাবের স্মৃতি। হয়তো হেরি তোমার চোখে আদিযুগের ইন্দ্রলোকে শিশুচাঁদের পথ-ভোলানো পারিজাতের ছায়াবীথি। এই কূলেতে ডাকি যখন সাড়া যে দাও সেই ওপারে, পরশ তোমার ছাড়িয়ে কায়া বাজে মায়ার বীণার তারে। হয়তো হবে সত্য তাই, হয়তো তোমার স্বপন, আমার আপন মনের মত্ততাই। আমি বলি স্বপ্ন যাহা তার চেয়ে কি সত্য আছে। যে তুমি মোর দূরের মানুষ সেই তুমি মোর কাছের কাছে। সেই তুমি আর নও তো বাঁধন, স্বপ্নরূপে মুক্তিসাধন, ফুলের সাথে তারার সাথে তোমার সাথে সেথায় মেলা। নিত্যকালের বিদেশিনী, তোমায় চিনি, নাই বা চিনি, তোমার লীলায় ঢেউ তুলে যায় কভু সোহাগ, কভু হেলা। চিত্তে তোমার মূর্তি নিয়ে ভাবসাগরের খেয়ায় চড়ি। বিধির মনের কল্পনারে আপন মনে নতুন গড়ি। আমার কাছে সত্য তাই, মন-ভরানো পাওয়ায় ভরা বাইরে-পাওয়ার ব্যর্থতাই। আপনি তুমি দেখেছ কি আপন-মাঝে সত্য কী যে। দিতে যদি চাও তা কারে, দিতে কি তাই পারো নিজে। হয়তো তারে দুঃখদিনে অগ্নি-আলোয় পাবে চিনে, তখন তোমার নিবিড় বেদন নিবেদনের জ্বালবে শিখা। অমৃত যে হয় নি মথন, তাই তোমাতে এই অযতন; তাই তোমারে ঘিরে আছে ছলন-ছায়ার কুহেলিকা। নিত্যকালের আপন তোমায় লুকিয়ে বেড়ায় মিথ্যা সাজে, ক্ষণে ক্ষণে ধরা পড়ে শুধু আমার স্বপন-মাঝে। আমি জানি সত্য তাই -- মরণ-দুঃখে অমর জাগে, অমৃতেরই তত্ত্ব তাই। পুষ্পমালার গ্রন্থিখানা অনাদরে পড়ুক ছিঁড়ে, ফুরাক বেলা, জীর্ণ খেলা হারাক হেলাফেলার ভিড়ে। ছল করে যা পিছু ডাকে পিছন ফিরে চাস নে তাকে, ডাকে না যে যাবার বেলায় যাস নে তাহার পিছে পিছে। যাওয়া- আসা-পথের ধুলায় চপল পায়ের চিহ্নগুলায় গ'নে গ'নে আপন মনে কাটাস নে দিন মিছে মিছে। কী হবে তোর বোঝাই করে ব্যর্থ দিনের আবর্জনা; স্বপ্ন শুধুই মর্তে অমর, আর সকলই বিড়ম্বনা। নিত্য প্রাণের সত্য তাই -- প্রাণ দিয়ে তুই রচিস যারে, অসীম পথের পথ্য তাই।