এ কবিতাগুলিও তোমাকে দিলাম। বহুকাল হইল, তোমার কাছে বসিয়াই লিখিতাম, তোমাকেই শুনাইতাম। সেই সমস্ত স্নেহের স্মৃতি ইহাদের মধ্যে বিরাজ করিতেছে। তাই, মনে হইতেছে তুমি যেখানেই থাক না কেন, এ লেখাগুলি তোমার চোখে পড়িবেই।
অসাধারণ বুদ্ধিমান লোকদের অনেকের সহসা নির্ব্বোধ বলিয়া ভ্রম হইয়া থাকে । তাহার কারণ --বুঝিবার পদ্ধতিকে, বুঝিবার ক্রম-বিশিষ্ট সোপানগুলিকে অনেক বুঝা মনে করেন। এই উভয়কে তাঁহারা স্বতন্ত্র করিয়া দেখিতে পারেন না,একত্র করিয়া দেখেন । যাঁহাদের বুদ্ধি বিদ্যুতের মত, বজ্রবেগে যাঁহাদের মাথায় ভাব আসিয়া পড়ে,যাহাদের বুঝার সোপান দেখা যায় না,কঙ্কাল দেখা যায় না,ইট ও মালমসলাগুলো দেখা যায় না, কেবল বুঝাটাই দেখা যায়,সাধারণ লোকেরা তাঁহাদের নির্ব্বোধ মনে করে, কারণ তাহার তাঁহাদের বুঝাকে বুঝিতে পারে না । যাদুকরেরা যাহা করে, তাহা যদি আস্তে আস্তে করে,তাহারা প্রতি অঙ্গ যদি দেখাইয়া দেখাইয়া করে, তবে দর্শক বেচারীরা সমস্ত বুঝিতে পারে। নহিলে তাহাদের ভেবাচেকা লাগিয়া যায়, কিছুই আয়ত্ত করিতে পারে না ও সমস্ত ইন্দ্রজাল বলিয়া ঠাহরায় । অসাধারণ বুদ্ধির এক দোষ এই যে , সে বুঝিতে যেমন পারে বুঝাইতে তেমন পারে না । বুঝাইবে কিরূপে বল? নিজে সে একটা বিষয় এত ভাল জানে ও এত সহজে জানে যে, তাহাকেও আবার কি করিয়া সহজ করিতে হইবে ভাবিয়া পায় না । ইহারা আপনাকে অপেক্ষাকৃত নির্ব্বোধ না করিয়া ফেলিলে অন্যকে বুঝাইতে পারে না । ইহাদের বুদ্ধি একটা সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইবামাত্র আবার তাহাকে সেখান হইতে বলপুর্ব্বক বাহির বরিয়া দিতে হয় ; যে পথ দিয়া বিদ্যুৎবেগে সে সেই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইয়াছিল, সেই পথ দিয়া অতি ধীরে ধীরে এক পা এক পা করিয়া তাহাকে ফিরাইয়া লইয়া যাইতে হয় ; সে ব্যক্তি অভ্যাসদোষে মাঝে মাঝে ছুটিয়া চলিতে চায়, অমনি তাহাকে পাক্ড়া করিয়া বলিতে হয় -- "আস্তে" ! কেহ বা ইচ্ছা করিলে এইরূপ নির্ব্বোধ হইতে পারে, কেহ বা পারে না । অনেকের বুদ্ধি কোন মতেই রাশ মানে না,তাহাকে আস্তে চালাইবার সাধ্য নাই । এইরূপ লোকেদের নির্ব্বোধ লোকেরা নির্ব্বোধ মনে করে । যাহারা স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়-টানা নৌকায় যায়, তাহারা প্রতি ঝাঁকানিতে প্রতি দাঁড়ের শব্দে বুঝিতে পারে যে, নৌকা অগ্রসর হইতেছে । যাহারা পালের নৌকায় চলে,তাহারা সকল সময়ে বুঝিতে পারে না নৌকা চলিতেছে কি না ।
ইংরাজশাসন-বিদ্বেষী একদল লোক ক্রোধভরে বলেন-- দেখ দেখি ইংরাজের কি অন্যায় ! প্রাচীন ভারতবর্ষের বিদ্যাবুদ্ধি লইয়া তাহার সভ্যতা; ভারতবর্ষের বিষয় পাইয়া সে ধনী; অথচ সেই ভারতবর্ষের প্রতি তাহার কি অন্যায় ব্যবহার ! আমার বক্তব্য এই যে, তাহারা ত ঠিক উত্তরাধিকারীর মত কাজ করিতেছে । ভারতবর্ষের মুখাগ্নি করিতেছে,ভারতবর্ষের শ্রাদ্ধ করিতেছে, আরও কি চাও ! ভূত ভারতবর্ষ যখন মাঝে মাঝে স্থানে স্থানে উপদ্রব করিতেছিল, তখন বড় বড় কামান-গোলার পিন্ডদান করিয়া তাহাকে একেবারে শান্ত করিয়াছে তাহা ছাড়া শাস্ত্রে বলে, নিজের সন্তানদের প্রতিপালন করিয়া লোকে পিতৃঋণ হইতে মুক্ত হয় । চিত্রগুপ্তের ছোট-আদালত হইতে এ ঋণের জন্য ইংরাজের নামে বোধ করি কোনো কালে ওয়ারেন্ট্ বাহির হইবে না । যে দেশে,যেখানে চরিবার প্রশস্ত মাঠ পাইয়াছে, Jane Cow (Johan Bull-এর স্ত্রীলিঙ্গ) সেইখানেই নিজের সন্তানগুলিকে চরাইয়া ও পরের সন্তানগুলিকে গুঁতাইয়া বেড়াইতেছে । অতএব উত্তরাধিকারীর ও পূর্ব্বপুরুষের কর্ত্তব্য-সাধনে তাহাদের কোন প্রকার শৈথিল্য লক্ষিত হইতেছে না। তবে তোমার নালিশ কি লইয়া?