এ কবিতাগুলিও তোমাকে দিলাম। বহুকাল হইল, তোমার কাছে বসিয়াই লিখিতাম, তোমাকেই শুনাইতাম। সেই সমস্ত স্নেহের স্মৃতি ইহাদের মধ্যে বিরাজ করিতেছে। তাই, মনে হইতেছে তুমি যেখানেই থাক না কেন, এ লেখাগুলি তোমার চোখে পড়িবেই।
ছোট বড় ডুবিয়া যাওয়া কথাটা সচরাচর ব্যবহার হইয়া থাকে। কিন্তু ডুবিয়া মরিবার ক্ষমতা ও অধিকার কয়জন লোকেরই বা আছে! কথাটার প্রকৃত ভাবই বা কে জানে! কবিরা, ভাবুকেরা, ভক্তেরা কেবল বলেন ডুবিয়া যাও, ইতর লোকেরা চারি দিকে চাহিয়া কঠিন মাটিতে পা দিয়া অবাক্ হইয়া বলে, ডুবিব কোন্ খানে, ডুবিবার স্থান কোথায়! যাহা-কিছু, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনন্ত সকলি, বালুকার কণা সেও অসীম অপার, তারি মধ্যে বাঁধা আছে অনন্ত আকাশ -- কে আছে, কে পারে তারে আয়ত্ত করিতে! বড় ছোট কিছু নাই, সকলি মহৎ। আঁখি মুদে জগতেরে বাহিরে ফেলিয়া, অসীমের অন্বেষণে কোথা গিয়েছিনু। Theres not the smallest orb which thou beholdest But in his motion like an angel sings. এ জগৎ মিথ্যা নয়, বুঝি সত্য হবে, অক্ষর আকারে শুধু লিখিত রয়েছে। অসীম হতেছে ব্যক্ত সীমা রূপ ধরি! ভাল ক'রে পড়িব এ জগতের লেখা। শুধু এ অক্ষর দেখে করিব না ঘৃণা। লোক হ'তে লোকান্তরে ভ্রমিতে ভ্রমিতে, একে একে জগতের পৃষ্ঠা উলটিয়া ক্রমে যুগে যুগে হবে জ্ঞানের বিস্তার! বিশ্বের যথার্থ রূপ কে পায় দেখিতে! আঁখি মেলি চারি দিকে করিব ভ্রমণ, ভালবেসে চাহিব এ জগতের পানে, তবে ত দেখিতে পাব স্বরূপ ইহার!
লিখিলেই লেখা শেষ হয় না। পুঁথি যে ক্রমেই বাড়িতে চলিল। আর, সকল কথা লিখিলেই বা পড়িবে কে? কাজেই এইখানেই লেখা সাঙ্গ করিলাম। আমার ভয় হইতেছে, পাছে এ লেখাগুলি লইয়া কেহ তর্ক করিতে বসেন। পাছে কেহ প্রমাণ জিজ্ঞাসা করিতে আসেন। পাছে কেহ ইহাদের সত্য-অসত্য আবশ্যক-অনাবশ্যক উপকার-অপকার লইয়া আন্দোলন উপস্থিত করেন। কারণ,এ বইখানি সে ভাবে লেখাই হয় নাই।
সকলেই কিছু নিজের মাথা হইতে গড়িতে পারে না, এই জন্যই ছাঁচের আবশ্যক হয়। সকলেই কিছু কবি নহে, এই জন্য অলঙ্কার শাস্ত্রের প্রয়োজন। গানের গলা অনেকেরই আছে, কিন্তু গানের প্রতিভা অল্প লোকেরই আছে, এই জন্যই অনেকেই গান গাহিতে পারেন না, রাগ রাগিণী গাহিতে পারেন। হৃদয়ের এমন একটা স্বভাব আছে, যে, যখনি তাহার ফুলবাগানে বসন্তের বাতাস বয় তখনি তার গাছে গাছে ডালে ডালে আপনি কুঁড়ি ধরে, আপনি ফুল ফুটিয়া উঠে। কিন্তু যার প্রাণে ফুলবাগান নাই, যার প্রাণে বসন্তের বাতাস বয় না, সে কি করে? সে প্যাটার্ণ কিনিয়া চোখে চশমা দিয়া পশমের ফুল তৈরি করে।