স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে, মনেও হয়নি তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা। তুমিও মূল্য করনি দাবি। দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত, দিলে ডালি উজাড় ক'রে। আড়চোখে চেয়ে আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে; পরদিনে মনে রইল না। নববসন্তের মাধবী যোগ দিয়েছিল তোমার দানের সঙ্গে, শরতের পূর্ণিমা দিয়েছিল তারে স্পর্শ। তোমার কালো চুলের বন্যায় আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে "তোমাকে যা দিই তোমার রাজকর তার চেয়ে অনেক বেশি; আরো দেওয়া হল না আরো যে আমার নেই।" বলতে বলতে তোমার চোখ এল ছলছলিয়ে। আজ তুমি গেছ চলে, দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত, তুমি আস না। এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে দেখছি তোমার রত্নমালা, নিয়েছি তুলে বুকে। যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা। তোমার প্রেমের দাম দেওয়া হল বেদনায়, হারিয়ে তাই পেলেম তোমায় পূর্ণ ক'রে।
প্রেম এসেছিল, চলে গেল সে যে খুলি দ্বার-- আর কভু আসিবে না। বাকি আছে শুধু আরেক অতিথি আসিবার, তারি সাথে শেষ চেনা। সে আসি প্রদীপ নিবাইয়া দিবে এক দিন, তুলি লবে মোরে রথে-- নিয়ে যাবে মোরে গৃহ হতে কোন্ গৃহহীন গ্রহতারকার পথে। ততকাল আমি একা বসি রব খুলি দ্বার, কাজ করি লব শেষ। দিন হবে যবে আরেক অতিথি আসিবার পাবে না সে বাধালেশ। পূজা-আয়োজন সব সারা হবে একদিন, প্রস্তুত হয়ে রব-- নীরবে বাড়ায়ে বাহু-দুটি সেই গৃহহীন অতিথিরে বরি লব। যে জন আজিকে ছেড়ে চলে গেল খুলি দ্বার সেই বলে গেল ডাকি, "মোছো আঁখিজল, আরেক অতিথি আসিবার এখনো রয়েছে বাকি।' সেই বলে গেল, "গাঁথা সেরে নিয়ো একদিন জীবনের কাঁটা বাছি, নবগৃহ-মাঝে বহি এনো, তুমি গৃহহীন, পূর্ণ মালিকাগাছি।'
মনে করো, তুমি থাকবে ঘরে, আমি যেন যাব দেশান্তরে। ঘাটে আমার বাঁধা আছে তরী, জিনিসপত্র নিয়েছি সব ভরি -- ভালো করে দেখ্ তো মনে করি কী এনে মা, দেব তোমার তরে। চাস কি মা, তুই এত এত সোনা -- সোনার দেশে করব আনাগোনা। সোনামতী নদীতীরের কাছে সোনার ফসল মাঠে ফ'লে আছে, সোনার চাঁপা ফোটে সেথায় গাছে -- না কুড়িয়ে আমি তো ফিরব না।
পরতে কি চাস মুক্তো গেঁথে হারে -- জাহাজ বেয়ে যাব সাগর-পারে। সেখানে মা, সকালবেলা হলে ফুলের 'পরে মুক্তোগুলি দোলে, টুপটুপিয়ে পড়ে ঘাসের কোলে -- যত পারি আনব ভারে ভারে। দাদার জন্যে আনব মেঘে-ওড়া পক্ষিরাজের বাচ্ছা দুটি ঘোড়া। বাবার জন্যে আনব আমি তুলি কনক-লতার চারা অনেকগুলি -- তোর তরে মা, দেব কৌটা খুলি সাত-রাজার-ধন মানিক একটি জোড়া।