মাকে আমার পড়ে না মনে। শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে একটা কী সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে, মায়ের কথা মিলায় যেন আমার খেলার মাঝে। মা বুঝি গান গাইত, আমার দোলনা ঠেলে ঠেলে; মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে। মাকে আমার পড়ে না মনে। শুধু যখন আশ্বিনেতে ভোরে শিউলিবনে শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে ফুলের গন্ধ আসে, তখন কেন মায়ের কথা আমার মনে ভাসে? কবে বুঝি আনত মা সেই ফুলের সাজি বয়ে, পুজোর গন্ধ আসে যে তাই মায়ের গন্ধ হয়ে। মাকে আমার পড়ে না মনে। শুধু যখন বসি গিয়ে শোবার ঘরের কোণে; জানলা থেকে তাকাই দূরে নীল আকাশের দিকে মনে হয়, মা আমার পানে চাইছে অনিমিখে। কোলের 'পরে ধরে কবে দেখত আমায় চেয়ে, সেই চাউনি রেখে গেছে সারা আকাশ ছেয়ে।
কে আমারে যেন এনেছে ডাকিয়া, এসেছি ভুলে। তবু একবার চাও মুখপানে নয়ন তুলে। দেখি, ও নয়নে নিমেষের তরে সেদিনের ছায়া পড়ে কি না পড়ে, সজল আবেগে আঁখিপাতা দুটি পড়ে কি ঢুলে। ক্ষণেকের তরে ভুল ভাঙায়ো না, এসেছি ভুলে। বেল-কুঁড়ি দুটি করে ফুটি-ফুটি অধর খোলা। মনে পড়ে গেল সেকালের সেই কুসুম তোলা। সেই শুকতারা সেই চোখে চায়, বাতাস কাহারে খুঁজিয়া বেড়ায়, উষা না ফুটিতে হাসি ফুটে তার গগনমূলে। সেদিন যে গেছে ভুলে গেছি, তাই এসেছি ভুলে। ব্যথা দিয়ে কবে কথা কয়েছিলে পড়ে না মনে, দূরে থেকে কবে ফিরে গিয়েছিলে নাই স্মরণে। শুধু মনে পড়ে হাসিমুখখানি, লাজে বাধো-বাধো সোহাগের বাণী, মনে পড়ে সেই হৃদয়-উছাস নয়ন-কূলে। তুমি যে ভুলেছ ভুলে গেছি, তাই এসেছি ভুলে। কাননের ফুল, এরা তো ভোলে নি, আমরা ভুলি? সেই তো ফুটেছে পাতায় পাতায় কামিনীগুলি। চাঁপা কোথা হতে এনেছে ধরিয়া অরুণকিরণ কোমল করিয়া, বকুল ঝরিয়া মরিবারে চায় কাহার চুলে? কেহ ভোলে, কেউ ভোলে না যে, তাই এসেছি ভুলে। এমন করিয়া কেমনে কাটিবে মাধবী রাতি? দখিনে বাতাসে কেহ নেই পাশে সাথের সাথি। চারি দিক হতে বাঁশি শোনা যায়, সুখে আছে যারা তারা গান গায়-- আকুল বাতাসে, মদির সুবাসে, বিকচ ফুলে, এখনো কি কেঁদে চাহিবে না কেউ আসিলে ভুলে?