এ প্রাণ, রাতের রেলগাড়ি, দিল পাড়ি-- কামরায় গাড়িভরা ঘুম, রজনী নিঝুম। অসীম আঁধারে কালি-লেপা কিছুনয় মনে হয় যারে নিদ্রার পারে রয়েছে সে পরিচয়হারা দেশে। ক্ষণ-আলো ইঙ্গিতে উঠে ঝলি, পার হয়ে যায় চলি অজানার পরে অজানায়, অদৃশ্য ঠিকানায়। অতিদূর-তীর্থের যাত্রী, ভাষাহীন রাত্রি, দূরের কোথা যে শেষ ভাবিয়া না পাই উদ্দেশ। চালায় যে নাম নাহি কয়; কেউ বলে, যন্ত্র সে, আর কিছু নয়। মনোহীন বলে তারে, তবু অন্ধের হাতে প্রাণমন সঁপি দিয়া বিছানা সে পাতে। বলে, সে অনিশ্চিত, তবু জানে অতি নিশ্চিত তার গতি। নামহীন যে অচেনা বার বার পার হয়ে যায় অগোচরে যারা সবে রয়েছে সেথায়, তারি যেন বহে নিশ্বাস, সন্দেহ-আড়ালেতে মুখ-ঢাকা জাগে বিশ্বাস। গাড়ি চলে, নিমেষ বিরাম নাই আকাশের তলে। ঘুমের ভিতরে থাকে অচেতনে কোন্ দূর প্রভাতের প্রত্যাশা নিদ্রিত মনে।
আমি যে তোমায় জানি, সে তো কেউ জানে না। তুমি মোর পানে চাও, সে তো কেউ মানে না। মোর মুখে পেলে তোমার আভাস কত জনে কত করে পরিহাস, পাছে সে না পারি সহিতে নানা ছলে তাই ডাকি যে তোমায়-- কেহ কিছু নারে কহিতে। তোমার পথ যে তুমি চিনায়েছ সে কথা বলি নে কাহারে। সবাই ঘুমালে জনহীন রাতে একা আসি তব দুয়ারে। স্তব্ধ তোমার উদার আলয়, বীণাটি বাজাতে মনে করি ভয়, চেয়ে থাকি শুধু নীরবে। চকিতে তোমার ছায়া দেখি যদি ফিরে আসি তব গরবে। প্রভাত না হতে কখন আবার গৃহকোণ-মাঝে আসিয়া বাতায়নে বসি বিহ্বল বীণা বিজনে বাজাই হাসিয়া। পথ দিয়ে যে বা আসে যে বা যায় সহসা থমকি চমকিয়া চায়, মনে করে তারে ডেকেছি-- জানে না তো কেহ কত নাম দিয়ে এক নামখানি ঢেকেছি। ভোরের গোলাপ সে গানে সহসা সাড়া দেয় ফুলকাননে, ভোরের তারাটি সে গানে জাগিয়া চেয়ে দেখে মোর আননে। সব সংসার কাছে আসে ঘিরে, প্রিয়জন সুখে ভাসে আঁখিনীরে, হাসি জেগে ওঠে ভবনে। যে নামে যে ছলে বীণাটি বাজাই সাড়া পাই সারা ভুবনে। নিশীথে নিশীথে বিপুল প্রাসাদে তোমার মহলে মহলে হাজার হাজার সোনার প্রদীপ জ্বলে অচপল অনলে। মোর দীপে জ্বেলে তাহারি আলোক পথ দিয়ে আসি, হাসে কত লোক, দূরে যেতে হয় পালায়ে-- তাই তো শিখা সে ভবনশিখরে পারি নে রাখিতে জ্বালায়ে। বলি নে তো কারে, সকালে বিকালে তোমার পথের মাঝেতে বাঁশি বুকে লয়ে বিনা কাজে আসি বেড়াই ছদ্মসাজেতে। যাহা মুখে আসে গাই সেই গান নানা রাগিণীতে দিয়ে নানা তান, এক গান রাখি গোপনে। নানা মুখপানে আঁখি মেলি চাই, তোমা-পানে চাই স্বপনে।