ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলি নি, কোন্ দেশে যে চলে গেছে সে-চঞ্চলিনী। সঙ্গী ছিল কুকুর কালু, বেশ ছিল তার আলুথালু, আপনা-'পরে অনাদরে ধুলায় মলিনী। হুটোপাটি ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিষ্কারণেই দিঘির জলে গাছের ডালে গতি ক্ষণে-ক্ষণেই। পাগলামি তার কানায় কানায়, খেয়াল দিয়ে খেলা বানায়, উচ্চহাসে কলভাষে কলকলিনী। দেখা হলে যখন-তখন বিনা অপরাধে মুখভঙ্গী করত আমায় অপমানের ছাঁদে। শাসন করতে যেমন ছুটি হঠাৎ দেখি ধুলায় লুটি' কাজল আঁখি চোখের জলে ছলছলিনী। আমার সঙ্গে পঞ্চাশবার জন্মশোধের আড়ি কথায় কথায় নিত্যকালের মতন ছাড়াছাড়ি। ডাকলে তারে "পুঁটলি' ব'লে সাড়া দিত মর্জি হলে, ঝগড়াদিনের নাম ছিল তার স্বর্ণনলিনী।
মৌমাছির মতো আমি চাহি না ভাণ্ডার ভরিবারে বসন্তেরে ব্যর্থ করিবারে। সে তো কভু পায় না সন্ধান কোথা আছে প্রভাতের পরিপূর্ণ দান। তাহার শ্রবণ ভরে আপন গুঞ্জনস্বরে, হারায় সে নিখিলের গান। জানে না ফুলের গন্ধে আছে কোন্ করুণ বিষাদ, সে জানে তা সংগ্রহের পথের সংবাদ। চাহে নি সে অরণ্যের পানে, লতার লাবণ্য নাহি জানে, পড়ে নি ফুলের বর্ণে বসন্তের মর্মবাণী লেখা। মধুকণা লক্ষ্য তার, তারি কক্ষ আছে শুধু শেখা। পাখির মতন মন শুধু উড়িবার সুখ চাহে উধাও উৎসাহে; আকাশের বক্ষ হতে ডানা ভরি তার স্বর্ণ-আলোকের মধু নিতে চায়, নাহি যার ভার, নাহি যার ক্ষয়, নাহি যার নিরুদ্ধ সঞ্চয়, যার বাধা নাই, যারে পাই তবু নাহি পাই-- যার তরে নহে লোভ, নহে ক্ষোভ, নহে তীক্ষ্ণ রিষ নহে শূল, নহে গুপ্ত বিষ।
মাটি আঁকড়িয়া থাকিবারে চাই তাই হয়ে যাই মাটি। "রবো' বলে যার লোভ কিছু নাই সেই রয়ে যায় খাঁটি। পাহাড় যে সেও ক্ষ'য়ে ক্ষ'য়ে মরে কালের দীর্ঘশ্বাসে মুকুল কেবল যতবার ঝরে ততবার ফিরে আসে।