ধূমকেতু মাঝে মাঝে হাসির ঝাঁটায় দ্যুলোক ঝাঁটিয়ে নিয়ে কৌতুক পাঠায় বিস্মিত সূর্যের সভা ত্বরিতে পারায়ে-- পরিহাসচ্ছটা ফেলে সুদূরে হারায়ে, সৌর বিদূষক পায় ছুটি। আমার জীবনকক্ষে জানি না কী হেতু, মাঝে মাঝে এসে পড়ে খ্যাপা ধূমকেতু-- তুচ্ছ প্রলাপের পুচ্ছ শূন্যে দেয় মেলি, ক্ষণতরে কৌতুকের ছেলেখেলা খেলি নেড়ে দেয় গম্ভীরের ঝুঁটি। এ জগৎ মাঝে মাঝে কোন্ অবকাশে কখনো বা মৃদুস্মিত কভু উচ্চহাসে হেসে ওঠে, দেখা যায় আলোকে ঝলকে-- তারা কেহ ধ্রুব নয়, পলকে পলকে চিহ্ন তার নিয়ে যায় মুছে। তিমির-আসনে যবে ধ্যানমগ্ন রাতি উল্কাবরিষনকর্তা করে মাতামাতি-- দুই হাতে মুঠা মুঠা কৌতুকের কণা ছড়ায় হরির লুঠ, নাহি যায় গনা, প্রহর-কয়েক যায় ঘুচে। অনেক অদ্ভুত আছে এ বিশ্বসৃষ্টিতে, বিধাতার স্নেহ তাহে সহাস্য দৃষ্টিতে। তেমনি হালকা হাসি দেবতার দানে রয়েছে খচিত হয়ে আমার সম্মানে-- মূল্য তার মনে মনে জানি। এত বুড়ো কোনোকালে হব নাকো আমি হাসি-তামাশারে যবে কব ছ্যাব্লামি। এ নিয়ে প্রবীণ যদি করে রাগারাগি বিধাতার সাথে তারে করি ভাগাভাগি হাসিতে হাসিতে লব মানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি যখন পাঠশালাতে যাই আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে, দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই ফেরিওলা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে। "চুড়ি চা--ই, চুড়ি চাই' সে হাঁকে, চীনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে, যায় সে চলে যে পথে তার খুশি, যখন খুশি খায় সে বাড়ি গিয়ে। দশটা বাজে, সাড়ে দশটা বাজে, নাইকো তাড়া হয় বা পাছে দেরি। ইচ্ছে করে সেলেট ফেলে দিয়ে অম্নি করে বেড়াই নিয়ে ফেরি। আমি যখন হাতে মেখে কালি ঘরে ফিরি, সাড়ে চারটে বাজে, কোদাল নিয়ে মাটি কোপায় মালী বাবুদের ওই ফুল-বাগানের মাঝে। কেউ তো তারে মানা নাহি করে কোদাল পাছে পড়ে পায়ের 'পরে। গায়ে মাথায় লাগছে কত ধুলো, কেউ তো এসে বকে না তার কাজে। মা তারে তো পরায় না সাফ জামা, ধুয়ে দিতে চায় না ধুলোবালি। ইচ্ছে করে আমি হতেম যদি বাবুদের ওই ফুল-বাগানের মালী। একটু বেশি রাত না হতে হতে মা আমারে ঘুম পাড়াতে চায়। জানলা দিয়ে দেখি চেয়ে পথে পাগড়ি প'রে পাহারওলা যায়। আঁধার গলি, লোক বেশি না চলে, গ্যাসের আলো মিট্মিটিয়ে জ্বলে, লণ্ঠনটি ঝুলিয়ে নিয়ে হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ির দরজায়। রাত হয়ে যায় দশটা এগারোটা কেউ তো কিছু বলে না তার লাগি। ইচ্ছে করে পাহারওলা হয়ে গলির ধারে আপন মনে জাগি।