গাঁয়ের পথে চলেছিলেম অকারণে, বাতাস বহে বিকালবেলা বেণুবনে। ছায়া তখন আলোর ফাঁকে লতার মতন জড়িয়ে থাকে, একা একা কোকিল ডাকে নিজমনে। আমি কোথায় চলেছিলেম অকারণে। জলের ধারে কুটিরখানি পাতা-ঢাকা, দ্বারের 'পরে নুয়ে পড়ে নিম্বশাখা। ওই যে শুনি মাঝে মাঝে না জানি কোন্ নিত্যকাজে কোথায় দুটি কাঁকন বাজে গৃহকোণে। যেতে যেতে এলেম হেথা অকারণে। দিঘির জলে ঝলক ঝলে মানিক হীরা, সর্ষেখেতে উঠছে মেতে মৌমাছিরা। এ পথ গেছে কত গাঁয়ে কত গাছের ছায়ে ছায়ে কত মাঠের গায়ে গায়ে কত বনে। আমি শুধু হেথায় এলেম অকারণে। আরেক দিন সে ফাগুন মাসে বহু আগে চলেছিলেম এই পথে সেই মনে জাগে। আমের বোলের গন্ধে অবশ বাতাস ছিল উদাস অলস, ঘাটের শানে বাজছে কলস ক্ষণে ক্ষণে। সে-সব কথা ভাবছি বসে অকারণে। দীর্ঘ হয়ে পড়ছে পথে বাঁকা ছায়া, গোষ্ঠঘরে ফিরছে ধেনু শ্রান্তকায়া। গোধূলিতে খেতের 'পরে ধূসর আলো ধূ ধূ করে, বসে আছে খেয়ার তরে পান্থজনে। আবার ধীরে চলছি ফিরে অকারণে।
হে প্রিয়, আজি এ প্রাতে নিজ হাতে কী তোমারে দিব দান। প্রভাতের গান? প্রভাত যে ক্লান্ত হয় তপ্ত রবিকরে আপনার বৃন্তটির 'পরে; অবসন্ন গান হয় অবসান। হে বন্ধু কী চাও তুমি দিবসের শেষে মোর দ্বারে এসে। কী তোমারে দিব আনি। সন্ধ্যাদীপখানি? এ-দীপের আলো এ যে নিরালা কোণের, স্তব্ধ ভবনের। তোমার চলার পথে এরে নিতে চাও জনতায়? এ যে হায় পথের বাতাসে নিবে যায়। কী মোর শকতি আছে তোমারে যে দিব উপহার। হোক ফুল, হোক-না গলার হার, তার ভার কেনই বা সবে, একদিন যবে নিশ্চিত শুকাবে তারা ম্লান ছিন্ন হবে। নিজ হতে তব হাতে যাহা দিব তুলি তারে তব শিথিল অঙ্গুলি যাবে ভুলি-- ধূলিতে খসিয়া শেষে হয়ে যাবে ধূলি। তার চেয়ে যবে ক্ষণকাল অবকাশ হবে, বসন্তে আমার পুষ্পবনে চলিতে চলিতে অন্যমনে অজানা গোপন গন্ধে পুলকে চমকি দাঁড়াবে থমকি, পথহারা সেই উপহার হবে সে তোমার। যেতে যেতে বীথিকায় মোর চোখেতে লাগিবে ঘোর, দেখিবে সহসা-- সন্ধ্যার কবরী হতে খসা একটি রঙিন আলো কাঁপি থরথরে ছোঁয়ায় পরশমণি স্বপনের 'পরে, সেই আলো, অজানা সে উপহার সেই তো তোমার। আমার যা শ্রেষ্ঠধন সে তো শুধু চমকে ঝলকে, দেখা দেয়, মিলায় পলকে। বলে না আপন নাম, পথেরে শিহরি দিয়া সুরে চলে যায় চকিতে নূপুরে। সেথা পথ নাহি জানি, সেথা নাহি যায় হাত, নাহি যায় বাণী। বন্ধু, তুমি সেথা হতে আপনি যা পাবে আপনার ভাবে, না-চাহিতে না-জানিতে সেই উপহার সেই তো তোমার। আমি যাহা দিতে পারি সামান্য সে দান-- হোক ফুল, হোক তাহা গান।
চারি দিকে খেলিতেছে মেঘ, বায়ু আসি করিছে চুম্বন -- সীমাহারা নভস্তল দুই বাহু পসারিয়া হৃদয়ে করিছে আলিঙ্গন। অনন্ত এ আকাশের কোলে টলমল মেঘের মাঝার এইখানে বাঁধিয়াছি ঘর তোর তরে কবিতা আমার! যবে আমি আসিব হেথায় মন্ত্র পড়ি ডাকিব তোমায়। বাতাসে উড়িবে তোর বাস, ছড়ায়ে পড়িবে কেশপাশ, ঈষৎ মেলিয়া আঁখি-পাতা মৃদু হাসি পড়িবে ফুটিয়া-- হৃদয়ের মৃদুল কিরণ অধরেতে পড়িবে লুটিয়া। এলো থেলো কেশপাশ লয়ে বসে বসে ,খেলিবি হেথায়, উষার অলক দুলাইয়া সমীরণ যেমন খেলায়। চুমিয়া চুমিয়া ফুটাইব আধোফোটা হাসির কুসুম, মুখ লয়ে বুকের মাঝারে গান গেয়ে পাড়াইব ঘুম। কৌতুকে করিয়া কোলাকুলি আসিবে মেঘের শিশুশুলি, ঘিরিয়া দাঁড়াবে তারা সবে অবাক হইয়া চেয়ে রবে। মেঘ হতে নেমে ধীরে ধীরে আয় লো কবিতা, মোর বামে-- চম্পক-অঙ্গুলি দুটি দিয়ে অন্ধকার ধীরে সরাইয়ে যেমন করিয়া উষা নামে। বায়ু হতে আয় লো কবিতা, আসিয়া বসিবি মোর পাশে-- কে জানে, বনের কোথা হতে ভেসে ভেসে সমীরণস্রোতে সৌরভ যেমন করে আসে। হৃদয়ের অন্তঃপুর হতে বধূ মোর, ধীরে ধীরে আয়-- ভীরু প্রেম যেমন করিয়া ধীরে উঠে হৃদয় ধরিয়া, বঁধুর পায়ের কাছে গিয়ে অমনি মুরছি পড়ে যায়। অথবা শিথিল কলেবরে এসো তুমি, বোসো মোর পাশে-- মরণ যেমন করে আসে, শিশির রেমনে করে ঝরে, পশ্চিমের আঁধারসাগরে তারাটি যেমন করে যায় অতি ধীরে মৃদু হেসে সিঁদুর সীমান্তদেশে? দিবা সে যেমন করে আসে মরিবারে স্বামীর চিতায় পশ্চিমের জ্বলন্ত শিখায়। পরবাসী ক্ষীণ-আয়ু একটি মুমূর্ষু বায়ু শেষ কথা বলিতে বলিতে তখনি যেমন মরে যায় তেমনি, তেমনি করে এসো-- কবিতা রে, বধূটি আমার, দুটি শুধু পড়িবে নিশ্বাস, দুটি শুধু বাহিরিবে বাণী, বাহু দুটি হৃদয়ে জড়ায়ে মরমে রাখিব মুখখানি।