দুজন সখীরে দূর হতে দেখেছিনু অজানার তীরে। জানি নে কাদের ঘর; দ্বার খোলা আকাশের পানে, দিনান্তে কহিতেছিল কী কথা কে জানে। এক নিমিষেতে অপরিচয়ের দেখা চলে যেতে যেতে উপরের দিকে চেয়ে। দুটি মেয়ে যেন দুটি আলোকণা আমার মনের পথে ছায়াতলে করিল রচনা ক্ষণতরে আকাশের বাণী, অর্থ তার নাহি জানি। যাহারা ওদের চেনে, নাম জানে, কাছে লয় টেনে, একসাথে দিন যাপে, প্রত্যহের বিচিত্র আলাপে ওদের বেঁধেছে তারা ছোটো করে পরিচয়ডোরে। সত্য নয় ঘরের ভিত্তিতে ঘেরা সেই পরিচয়। যাবে দিন, সে জানা কোথায় হবে লীন। বন্ধহীন অনন্তের বক্ষতলে উঠিয়াছে জেগে কী নিশ্বাসবেগে যুগলতরঙ্গসম। অসীম কালের মাঝে ওরা অনুপম, ওরা অনুদ্দেশ, কোথায় ওদের শেষ ঘরের মানুষ জানে সে কি? নিত্যের চিত্তের পটে ক্ষণিকের চিত্র গেনু দেখি-- আশ্চর্য সে লেখা, সে তুলির রেখা যুগযুগান্তর-মাঝে একবার দেখা দিল নিজে-- জানি নে তাহার পরে কী যে।
প্রদীপ যখন নিবেছিল, আঁধার যখন রাতি, দুয়ার যখন বন্ধ ছিল, ছিল না কেউ সাথি-- মনে হল অন্ধকারে কে এসেছে বাহির-দ্বারে, মনে হল শুনি যেন পায়ের ধ্বনি কার, রাতের হাওয়ায় বাজল বুঝি কঙ্কণঝংকার। বারেক শুধু মনে হল খুলি, দুয়ার খুলি। ক্ষণেক পরে ঘুমের ঘোরে কখন গেনু ভুলি। "কোন্ অতিথি দ্বারের কাছে একলা রাতে বসে আছে?' ক্ষণে ক্ষণে তন্দ্রা ভেঙে মন শুধাল যবে বলেছিলেম, "আর কিছু নয়, স্বপ্ন আমার হবে।' মাঝ-গগনে সপ্ত-ঋষি স্তব্ধ গভীর রাতে জানলা হতে আমায় যেন ডাকল ইশারাতে। মনে হল "শয়ন ফেলে, দিই-না কেন আলো জ্বেলে'-- আলসভরে রইনু শুয়ে হল না দীপ জ্বালা। প্রহর পরে কাটল প্রহর, বন্ধ রইল তালা। জাগল কখন দখিন-হাওয়া কাঁপল বনের হিয়া, স্বপ্নে কথা-কওয়ার মতো উঠল মর্মরিয়া। যুথীর গন্ধ ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছিল মোর বাতায়নে, শিহর দিয়ে গেল আমার সকল অঙ্গ চুমে। জেগে উঠে আবার কখন ভরল নয়ন ঘুমে। ভোরের তারা পুব-গগনে যখন হল গত বিদায়রাতির একটি ফোঁটা চোখের জলের মতো, হঠাৎ মনে হল তবে-- যেন কাহার করুণ রবে শিরীষ ফুলের গন্ধে আকুল বনের বীথি ব্যেপে শিশির-ভেজা তৃণগুলি উঠল কেঁপে কেঁপে। শয়ন ছেড়ে উঠে তখন খুলে দিলেম দ্বার-- হায় রে, ধুলায় বিছিয়ে গেছে যূথীর মালা কার। ওই যে দূরে, নয়ন নত, বনের ছায়ায় ছায়ার মতো মায়ার মতো মিলিয়ে গেল অরুণ-আলোয় মিশে, ওই বুঝি মোর বাহির-দ্বারের রাতের অতিথি সে। আজ হতে মোর ঘরের দুয়ার রাখব খুলে রাতে। প্রদীপখানি রইবে জ্বালা বাহির-জানালাতে। আজ হতে কার পরশ লাগি পথ তাকিয়ে রইব জাগি-- আর কোনোদিন আসবে না কি আমার পরান ছেয়ে যূথীর মালার গন্ধখানি রাতের বাতাস বেয়ে।
আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে, তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে। অপূর্ব এক স্বপ্ন-সম লাগতেছিল চক্ষে মম-- কী বিচিত্র শোভা তোমার, কী বিচিত্র সাজ। আমি মনে ভাবেতেছিলেম, এ কোন্ মহারাজ। আজি শুভক্ষণে রাত পোহালো ভেবেছিলেম তবে, আজ আমারে দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে। বাহির হতে নাহি হতে কাহার দেখা পেলেম পথে, চলিতে রথ ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে-- মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব, নেব ভারে ভারে। দেখি সহসা রথ থেমে গেল আমার কাছে এসে, আমার মুখপানে চেয়ে নামলে তুমি হেসে। দেখে মুখের প্রসন্নতা জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা, হেনকালে কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ "আমায় কিছু দাও গো' বলে বাড়িয়ে দিলে হাত। মরি, এ কী কথা রাজাধিরাজ, "আমায় দাও গো কিছু'! শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা-নিচু। তোমার কী-বা অভাব আছে ভিখারী ভিক্ষুকের কাছে। এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা। ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা। যবে পাত্রখানি ঘরে এনে উজাড় করি-- এ কী! ভিক্ষামাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি। দিলেম যা রাজ-ভিখারীরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে, তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভরে-- তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে।