কেউ চেনা নয় সব মানুষই অজানা। চলেছে আপনার রহস্যে আপনি একাকী। সেখানে তার দোসর নেই। সংসারের ছাপমারা কাঠামোয় মানুষের সীমা দিই বানিয়ে। সংজ্ঞার বেড়া-দেওয়া বসতির মধ্যে বাঁধা মাইনের কাজ করে সে। থাকে সাধারণের চিহ্ন নিয়ে ললাটে। এমন সময় কোথা থেকে ভালোবাসার বসন্ত-হাওয়া লাগে, সীমার আড়ালটা যায় উড়ে, বেরিয়ে পড়ে চির-অচেনা। সামনে তাকে দেখি স্বয়ংস্বতন্ত্র, অপূর্ব, অসাধারণ, তার জুড়ি কেউ নেই। তার সঙ্গে যোগ দেবার বেলায় বাঁধতে হয় গানের সেতু, ফুলের ভাষায় করি তার অভ্যর্থনা। চোখ বলে, যা দেখলুম, তুমি আছ তাকে পেরিয়ে। মন বলে চোখে-দেখা কানে-শোনার ওপারে যে রহস্য তুমি এসেছ সেই অগমের দূত,-- রাত্রি যেমন আসে পৃথিবীর সামনে নক্ষত্রলোক অবারিত ক'রে। তখন হঠাৎ দেখি আমার মধ্যেকার অচেনাকে, তখন আপন অনুভবের তল খুঁজে পাইনে, সেই অনুভব "তিলে তিলে নূতন হোয়।"
ব্যঙ্গসুনিপুণা, শ্লেষবাণসন্ধানদারুণা! অনুগ্রহবর্ষণের মাঝে বিদ্রূপবিদ্যুৎঘাত অকস্মাৎ মর্মে এসে বাজে। সে যেন তুফান যাহারে চঞ্চল করে সে তরীকে করে খানখান অট্টহাস্য আঘাতিয়া এপাশে ওপাশে; প্রশ্রয়ের বীথিকায় ঘাসে ঘাসে রেখেছে সে কণ্টক-অঙ্কুর বুনে বুনে; অদৃশ্য আগুনে কুঞ্জ তার বেড়িয়াছে; যারা আসে কাছে সব থেকে তারা দূরে রয়; মোহমন্ত্রে যে হৃদয় করে জয় তারি 'পরে অবজ্ঞায় দারুণ নির্দয়। আপন তপস্যা লয়ে যে পুরুষ নিশ্চল সদাই, যে উহারে ফিরে চাহে নাই, জানি সেই উদাসীন একদিন জিনিয়াছে ওরে; জ্বালাময়ী তারি পায়ে দীপ্ত দীপ দিল অর্ঘ্য ভরে। বিদুষী নিয়েছে বিদ্যা শুধু চিত্তে নয়, আপন রূপের সাথে ছন্দ তারে দিল অঙ্গময়; বুদ্ধি তার ললাটিকা, চক্ষুর তারায় বুদ্ধি জ্বলে দীপশিখা; বিদ্যা দিয়ে রচে নাই পণ্ডিতের স্থূল অহংকার, বিদ্যারে করেছে অলংকার। প্রসাধনসাধনে চতুরা-- জানে সে ঢালিতে সুরা ভূষণভঙ্গিতে, অলক্তের আরক্ত ইঙ্গিতে। জাদুকরী বচনে চলনে; গোপন সে নাহি করে আপন ছলনে; অকপট মিথ্যারে সে নানা রসে করিয়া মধুর নিন্দা তার করি দেয় দূর; জ্যোৎস্নার মতন গোপনেও নহে সে গোপন। আঁধার আলোরি কোলে রয়েছে জাগরি-- নাম কি নাগরী।