যৌবন হচ্ছে জীবনে সেই ঋতুপরিবর্তনের সময় যখন ফুল ও ফসলের প্রচ্ছন্ন প্রেরণা নানা বর্ণে ও রূপে অকস্মাৎ বাহিরে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। কড়ি ও কোমল আমার সেই নবযৌবনের রচনা। আত্মপ্রকাশের একটা প্রবল আবেগ তখন যেন প্রথম উপলব্ধি করেছিলুম। মনে পড়ে তখনকার দিনে নিজের মনের একটা উদ্বেল অবস্থা। তখন আমার বেশভূষায় আবরণ ছিল বিরল। গায়ে থাকত ধুতির সঙ্গে কেবল একটা পাতলা চাদর, তার খুঁটোয় বাঁধা ভোরবেলায় তোলা একমুঠো বেলফুল, পায়ে একজোড়া চটি। মনে আছে থ্যাকারের দোকানে বই কিনতে গেছি কিন্তু এর বেশি পরিচ্ছন্নতা নেই, এতে ইংরেজ দোকানদারের স্বীকৃত আদবকায়দার প্রতি উপেক্ষা প্রকাশ হত। এই আত্মবিস্মৃত বেআইনী প্রমত্ততা কড়ি ও কোমলের কবিতায় অবাধে প্রকাশ পেয়েছিল। এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে রাখতে হবে এই রীতির কবিতা তখনো প্রচলিত ছিল না। সেইজন্যেই কাব্যবিশারদ প্রভৃতি সাহিত্যবিচারকদের কাছ থেকে কটুভাষায় ভর্ৎসনা সহ্য করেছিলুম। সে-সব যে উপেক্ষা করেছি অনায়াসে সে কেবল যৌবনের তেজে। আপনার মধ্যে থেকে যা প্রকাশ পাচ্ছিল, সে আমার কাছেও ছিল নূতন এবং আন্তরিক। তখন হেম বাঁড়ুজ্জে এবং নবীন সেন ছাড়া এমন কোনো দেশপ্রসিদ্ধ কবি ছিলেন না যাঁরা নূতন কবিদের কোনো-একটা কাব্যরীতির বাঁধা পথে চালনা করতে পারতেন। কিন্তু আমি তাঁদের সম্পূর্ণই ভুলে ছিলুম। আমাদের পরিবারের বন্ধু কবি বিহারীলালকে ছেলেবেলা থেকে জানতুম এবং তাঁর কবিতার প্রতি অনুরাগ আমার ছিল অভ্যস্ত। তাঁর প্রবর্তিত কবিতার রীতি ইতিপূর্বেই আমার রচনা থেকে সম্পূর্ণ স্খলিত হয়ে গিয়েছিল। বড়োদাদার স্বপ্নপ্রয়াণের আমি ছিলুম অত্যন্ত ভক্ত, কিন্তু তাঁর বিশেষ কবিপ্রকৃতির সঙ্গে আমার বোধ হয় মিল ছিল না, সেইজন্য ভালোলাগা সত্ত্বেও তাঁর প্রভাব আমার কবিতা গ্রহণ করতে পারে নি। তাই কড়ি ও কোমলের কবিতা মনের অন্তঃস্তরের উৎসের থেকে উছলে উঠেছিল। তার সঙ্গে বাহিরের কোনো মিশ্রণ যদি ঘটে থাকে তো সে গৌণভাবে। এই আমার কবিতা প্রথম কবিতার বই যার মধ্যে বিষয়ের বৈচিত্র৻ এবং বহির্দৃষ্টিপ্রবণতা দেখা দিয়েছে। আর প্রথম আমি সেই কথা বলেছি যা পরবর্তী আমার কাব্যের অন্তরে অন্তরে বারবার প্রবাহিত হয়েছে-- মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই,-- বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়।
তবে পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে রূপ না দিলে যদি বিধি হে! পূজার তরে হিয়া উঠে যে ব্যাকুলিয়া, পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে! মনে গোপনে থাকে প্রেম, যায় না দেখা, কুসুম দেয় তাই দেবতায়। দাঁড়ায়ে থাকি দ্বারে, চাহিয়া দেখি তারে, কী ব'লে আপনারে দিব তায়? ভালো বাসিলে ভালো যারে দেখিতে হয় সে যেন পারে ভালো বাসিতে। মধুর হাসি তার দিক সে উপহার মাধুরী ফুটে যার হাসিতে। যার নবনীসুকুমার কপোলতল কী শোভা পায় প্রেমলাজে গো! যাহার ঢলঢল নয়নশতদল তারেই আঁখিজল সাজে গো। তাই লুকায়ে থাকি সদা পাছে সে দেখে, ভালোবাসিতে মরি শরমে। রুধিয়া মনোদ্বার প্রেমের কারাগার রচেছি আপনার মরমে। আহা এ তনু-আবরণ শ্রীহীন ম্লান ঝরিয়া পড়ে যদি শুকায়ে, হৃদয়মাঝে মম দেবতা মনোরম মাধুরী নিরুপম লুকায়ে। যত গোপনে ভালোবাসি পরান ভরি পরান ভরি উঠে শোভাতে-- যেমন কালো মেঘে অরুণ-আলো লেগে মাধুরী উঠে জেগে প্রভাতে। আমি সে শোভা কাহারে তো দেখাতে নারি, এ পোড়া দেহ সবে দেখে যায়-- প্রেম যে চুপে চুপে ফুটিতে চাহে রূপে, মনেরই অন্ধকূপে থেকে যায়। দেখো বনের ভালোবাসা আঁধারে বসি কুসুমে আপনারে বিকাশে, তারকা নিজ হিয়া তুলিছে উজলিয়া আপন আলো দিয়া লিখা সে। ভবে প্রেমের আঁখি প্রেম কাড়িতে চাহে, মোহন রূপ তাই ধরিছে। আমি যে আপনায় ফুটাতে পারি নাই, পরান কেঁদে তাই মরিছে। আমি আপন মধুরতা আপনি জানি পরানে আছে যাহা জাগিয়া, তাহারে লয়ে সেথা দেখাতে পারিলে তা যেত এ ব্যাকুলতা ভাগিয়া। আমি রূপসী নহি, তবু আমারো মনে প্রেমের রূপ সে তো সুমধুর। ধন সে যতনের শয়ন-স্বপনের, করে সে জীবনের তমোদূর। আমি আমার অপমান সহিতে পারি প্রেমের সহে না তো অপমান। অমরাবতী ত্যেজে হৃদয়ে এসেছে যে, তাহারো চেয়ে সে যে মহীয়ান। পাছে কুরূপ কভু তারে দেখিতে হয় কুরূপ দেহ-মাঝে উদিয়া, প্রাণের এক ধারে দেহের পরপারে তাই তো রাখি তারে রুধিয়া। তাই আঁখিতে প্রকাশিতে চাহি নে তারে, নীরবে থাকে তাই রসনা। মুখে সে চাহে যত নয়ন করি নত, গোপনে মরে কত বাসনা। তাই যদি সে কাছে আসে পালাই দূরে, আপন মনো-আশা দলে যাই, পাছে সে মোরে দেখে থমকি বলে "এ কে!" দু-হাতে মুখ ঢেকে চলে যাই। পাছে নয়নে বচনে সে বুঝিতে পারে আমার জীবনের কাহিনী-- পাছে সে মনে ভানে, "এও কি প্রেম জানে! আমি তো এর পানে চাহি নি!" তবে পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে রূপ না দিলে যদি বিধি হে! পূজার তরে হিয়া উঠে যে ব্যাকুলিয়া, পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে!