আচ্ছাদন হতে ডেকে লহো মোরে তব চক্ষুর আলোতে। অজ্ঞাত ছিলাম এতদিন পরিচয়হীন-- সেই অগোচরদুঃখভার বহিয়া চলেছি পথে; শুধু আমি অংশ জনতার। উদ্ধার করিয়া আনো, আমারে সম্পূর্ণ করি জানো। যেথা আমি একা সেথায় নামুক তব দেখা। সে মহানির্জন যে গহনে অন্তর্যামী পাতেন আসন, সেইখানে আনো আলো, দেখো মোর সব মন্দ ভালো, যাক লজ্জা ভয়, আমার সমস্ত হোক তব দৃষ্টিময়। ছায়া আমি সবা-কাছে, অস্ফুট আমি-যে, তাই আমি নিজে তাহাদের মাঝে নিজেরে খুঁজিয়া পাই না-যে। তারা মোর নাম জানে, নাহি জানে মান, তারা মোর কর্ম জানে, নাহি জানে মর্মগত প্রাণ। সত্য যদি হই তোমা-কাছে তবে মোর মূল্য বাঁচে, তোমার মাঝারে বিধির স্বতন্ত্র সৃষ্টি জানিব আমারে। প্রেম তব ঘোষিবে তখন অসংখ্য যুগের আমি একান্ত সাধন। তুমি মোরে করো আবিষ্কার, পূর্ণ ফল দেহো মোরে আমার আজন্ম প্রতীক্ষার। বহিতেছি অজ্ঞাতির বন্ধন সদাই, মুক্তি চাই তোমার জানার মাঝে সত্য তব যেথায় বিরাজে।
সংসারেতে দারুণ ব্যথা লাগায় যখন প্রাণে "আমি যে নাই' এই কথাটাই মনটা যেন জানে। যে আছে সে সকল কালের, এ কাল হতে ভিন্ন-- তাহার গায়ে লাগে না তো কোনো ক্ষতের চিহ্ন।
মৌমাছির মতো আমি চাহি না ভাণ্ডার ভরিবারে বসন্তেরে ব্যর্থ করিবারে। সে তো কভু পায় না সন্ধান কোথা আছে প্রভাতের পরিপূর্ণ দান। তাহার শ্রবণ ভরে আপন গুঞ্জনস্বরে, হারায় সে নিখিলের গান। জানে না ফুলের গন্ধে আছে কোন্ করুণ বিষাদ, সে জানে তা সংগ্রহের পথের সংবাদ। চাহে নি সে অরণ্যের পানে, লতার লাবণ্য নাহি জানে, পড়ে নি ফুলের বর্ণে বসন্তের মর্মবাণী লেখা। মধুকণা লক্ষ্য তার, তারি কক্ষ আছে শুধু শেখা। পাখির মতন মন শুধু উড়িবার সুখ চাহে উধাও উৎসাহে; আকাশের বক্ষ হতে ডানা ভরি তার স্বর্ণ-আলোকের মধু নিতে চায়, নাহি যার ভার, নাহি যার ক্ষয়, নাহি যার নিরুদ্ধ সঞ্চয়, যার বাধা নাই, যারে পাই তবু নাহি পাই-- যার তরে নহে লোভ, নহে ক্ষোভ, নহে তীক্ষ্ণ রিষ নহে শূল, নহে গুপ্ত বিষ।