কেন মনে হয়-- তোমার এ গানখানি এখনি যে শোনালে তা নয়। বিশেষ লগ্নের কোনো চিহ্ন পড়ে নাই এর সুরে; শুধু এই মনে পড়ে, এই গানে দিগন্তের দূরে আলোর কাঁপনখানি লেগেছিল সন্ধ্যাতারকার সুগভীর স্তব্ধতায়,সে-স্পন্দন শিরায় আমার রাগিণীর চমকেতে রহি রহি বিচ্ছুরিছে আলো আজি দেয়ালির দিনে। আজো এই অন্ধকারে জ্বালো সেই সায়াহ্নের স্মৃতি, যে নিভৃতে নক্ষত্রসভায় নীহারিকা ভাষা তার প্রসারিল নিঃশব্দ প্রভায়-- যে-ক্ষণে তোমার স্বর জ্যোতির্লোকে দিতেছিল আনি অনন্তের-পথ-চাওয়া ধরিত্রীর সকরুণ বাণী। সেই স্মৃতি পার হয়ে মনে মোর এই প্রশ্ন লাগে, কালের-অতীত প্রান্তে তোমারে কি চিনিতাম আগে। দেখা হয়েছিল না কি কোনো-এক সংগীতের পথে অরূপের মন্দিরেতে অপরূপ ছন্দের জগতে।
বেহাগ আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন বাতাসে-- তাই আকাশকুসুম করিনু চয়ন হতাশে। ছায়ার মতন মিলায় ধরণী, কূল নাহি পায় আশার তরণী, মানসপ্রতিমা ভাসিয়া বেড়ায় আকাশে। কিছু বাঁধা পড়িল না শুধু এ বাসনা- বাঁধনে। কেহ নাহি দিল ধরা শুধু এ সুদূর সাধনে। আপনার মনে বসিয়া একেলা অনলশিখায় কী করিনু খেলা, দিনশেষে দেখি ছাই হল সব হুতাশে! আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন বাতাসে।
আমার এ মনোজ্বালা কে বুঝিবে সরলে কেন যে এমন করে, ম্রিয়মাণ হয়ে থাকি কেন যে নীরবে হেন বসে থাকি বিরলে। এ যাতনা কেহ যদি বুঝিতে পারিত দেবি, তবে কি সে আর কভু পারিত গো হাসিতে? হৃদয় আছয়ে যার সঁপিতে পারে সে প্রাণ এ জ্বলন্ত যন্ত্রণার এক তিল নাশিতে! হে সখী হে সখাগণ, আমার মর্মের জ্বালা কেহই তোমরা যদি না পার গো বুঝিতে, কী আগুন জ্বলে তার নিভৃত গভীর তলে কী ঘোর ঝটিকা সনে হয় তারে যুঝিতে। তবে গো তোমরা মোরে শুধায়ো না শুধায়ো না কেন যে এমন করে রহিয়াছি বসিয়া বিরলে আমারে হেথা, একলা থাকিতে দাও, [আমা]র মনের কথা বুঝিবে কী করিয়া? [ম্রিয়]মাণ মুখে, এই শূন্যপ্রায় নেত্রে [ক]লঙ্ক সঁপি গো আমি তোমাদের হরষে; পূর্ণিমা যামিনী যথা মলিন হইয়া যায় ক্ষুদ্র এক অন্ধকার জলদের পরশে। কিন্তু কী করিব বলো, কী চাও কী দিব আমি তোমাদের আমোদ গো এক তিল বাড়াতে হৃদয়ে এমন জ্বালা, কী করে হাসিব বলো কিছুতে বিষণ্ণভাব পারি না যে তাড়াতে। বিরক্ত হোয়ো না সখি, অমন বিরক্ত নেত্রে আমার মুখের পানে রহিয়ো না চাহিয়া, কী আঘাত লাগে প্রাণে, দেখি ও বিরক্ত মুখ কেমনে সখি গো তাহা বুঝাইব কহিয়া? ব্যথায় পাইয়া ব্যথা, যদি গো শুধাতে কথা অশ্রুজলে মিশাইতে যদি অশ্রুজল আদরে স্নেহের স্বরে, একটি কহিতে কথা, অনেক নিভিত তবু এ হৃদি-অনল জানিতাম ওগো সখি, কাঁদিলে মমতা পাব, কাঁদিলে বিরক্ত হবে এ কী নিদারুণ? চরণে ধরি গো সখি, একটু করিয়ো দয়া নহিলে নিভিবে কিসে বুকের আগুন! ...