এবারের মতো করো শেষ প্রাণে যদি পেয়ে থাকো চরমের পরম উদ্দেশ; যদি অবসান সুমধুর আপন বীণার তারে সকল বেসুর সুরে বেঁধে তুলে থাকে; অস্তরবি যদি তোরে ডাকে দিনেরে মাভৈঃ বলে যেমন সে ডেকে নিয়ে যায় অন্ধকার অজানায়; সুন্দরের শেষ অর্চনায় আপনার রশ্মিচ্ছটা সম্পূর্ণ করিয়া দেয় সারা; যদি সন্ধ্যাতারা অসীমের বাতায়নতলে শান্তির প্রদীপশিখা দেখায় কেমন করে জ্বলে; যদি রাত্রি তার খুলে দেয় নীরবের দ্বার, নিয়ে যায় নিঃশব্দ সংকেতে ধীরে ধীরে সকল বাণীর শেষ সাগরসংগম-তীর্থ-তীরে; সেই শতদল হতে যদি গন্ধ পেয়ে থাকো তার মানসসরসে যাহা শেষ অর্ঘ্য, শেষ নমস্কার।
অনেককালের একটিমাত্র দিন কেমন করে বাঁধা পড়েছিল একটা কোনো ছন্দে, কোনো গানে, কোনো ছবিতে। কালের দূত তাকে সরিয়ে রেখেছিল চলাচলের পথের বাইরে। যুগের ভাসান খেলায় অনেক কিছু চলে গেল ঘাট পেরিয়ে, সে কখন ঠেকে গিয়েছিল বাঁকের মুখে কেউ জানতে পারে নি। মাঘের বনে আমের কত বোল ধরল, কত পড়ল ঝরে; ফাল্গুনে ফুটল পলাশ, গাছতলার মাটি দিল ছেয়ে; চৈত্রের রৌদ্রে আর সর্ষের খেতে কবির লড়াই লাগল যেন মাঠে আর আকাশে। আমার সেই আটকে-পড়া দিনটির গায়ে কোনো ঋতুর কোনো তুলির চিহ্ন লাগেনি। একদা ছিলেম ঐ দিনের মাঝখানেই। দিনটা ছিল গা ছড়িয়ে নানা কিছুর মধ্যে; তারা সমস্তই ঘেঁষে ছিল আশেপাশে সামনে। তাদের দেখে গেছি সবটাই কিন্তু চোখে পড়েনি সমস্তটা। ভালোবেসেছি, ভালো করে জানিনি কতখানি বেসেছি। অনেক গেছে ফেলাছড়া; আনমনার রসের পেয়ালায় বাকি ছিল কত। সেদিনের যে পরিচয় ছিল আমার মনে আজ দেখি তার চেহারা অন্য ছাঁদের। কত এলোমেলো, কত যেমন-তেমন সব গেছে মিলিয়ে। তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে পড়েছে যে তাকে আজ দূরের পটে দেখছি যেন সেদিনকার সে নববধূ। তনু তার দেহলতা, ধূপছায়া রঙের আঁচলটি মাথায় উঠেছে খোঁপাটুকু ছাড়িয়ে। ঠিকমতো সময়টি পাই নি। তাকে সব কথা বলবার, অনেক কথা বলা হয়েছে যখন-তখন, সে-সব বৃথা কথা। হতে হতে বেলা গেছে চলে। আজ দেখা দিয়েছে তার মূর্তি,-- স্তব্ধ সে দাঁড়িয়ে আছে ছায়া-আলোর বেড়ার মধ্যে, মনে হচ্ছে কী একটা কথা বলবে, বলা হল না,-- ইচ্ছে করছে ফিরে যাই পাশে, ফেরার পথ নেই।
আজ হল রবিবার, খুব মোটা বহরের কগজের এডিশন; যত আছে শহরের কানাকানি, যত আছে আজগবি সংবাদ, যায় নিকো কোনোটার একটুও রঙ বাদ। "বার্তাকু' লিখে দিল, গুজরানওয়ালায় দলে দলে জোট করে পাঞ্জাবি গোয়ালায়। বলে তারা, গোরু পোষা গ্রাম্য এ কারবার প্রগতির যুগ আজ দিন এল ছাড়বার। আজ থেকে প্রত্যহ রাত্তির পোয়ালেই বসবে প্রেপরিটরি ক্লাস এই গোয়ালেই। স্তূপ রচা দুই বেলা খড়-ভুষি-ঘাসটার ছেড়ে দিয়ে হবে ওরা ইস্কুলমাস্টার। হম্বাধ্বনি যাহা গো-শিশু গো-বৃদ্ধের অন্তর্ভূত হবে বই-গেলা বিদ্যের। যত অভ্যেস আছে লেজ ম'লে পিটোনো ছেলেদের পিঠে হবে পেট ভ'রে মিটোনো। "গদাধরে' রেগে লেখে, এ কেমন ঠাট্টা-- বার্তাকু পরে পরে সাতটা কি আটটা যা লিখেছে সব কটা সমাজের বিরোধী, মতগুলো প্রগতির দ্বার আছে নিরোধি। সেদিন সে লিখেছিল, ঘুঁটে চাই চালানো, শহরের ঘরে ঘরে ঘুঁটে হোক জ্বালানো। কয়লা ঘুঁটেতে যেন সাপে আর নেউলে, ঝড়িয়াকে করে দিক একদম দেউলে। সেনেট হাউস আদি বড়ো বড়ো দেয়ালী শহরের বুক জুরে আছে যেন হেঁয়ালি। ঘুঁটে দিয়ে ভরা হোক, এই এক ফতোয়ায় এক দিনে শহরের বেড়ে যাবে কত আয়। গোয়ালারা চোনা যদি জমা করে গামলায় কত টাকা বাঁচে তবে জল-দেওয়া মামলায়। বার্তাকু কাগজের ব্যঙ্গে যে গা জ্বলে, সুন্দর মুখ পেলে লেপে ওরা কাজলে। এ-সকল বিদ্রূপে বুদ্ধি যে খেলো হয়, এ দেশের আবহাওয়া ভারি এলোমেলো হয়। গদাধর কাগজের ধমকানি থামল, হেসে উঠে বার্তাকু যুদ্ধেতে নামল। বলে, ভায়া, এ জগতে ঠাট্টা সে ঠাট্টাই-- গদাধর, গদা রেখে লও সেই পাঠটাই। মাস্টার না হয়ে যে হলে তুমি এডিটর এ লাগি তোমার কাছে দেশটাই ক্রেডিটর। এডুকেশনের পথে হয় নি যে মতি তব, এই পুণ্যেই হবে গোকুলেই গতি তব। অবশেষে এ দুখানা কাগজের আসরে বচসার ঝাঁজ দেখে ভয়ে কথা না সরে।