কোলে ছিল সুরে-বাঁধা বীণা মনে ছিল বিচিত্র রাগিণী, মাঝখানে ছিঁড়ে যাবে তার সে কথা ভাবি নি। ওগো আজি প্রদীপ নিবাও, বন্ধ করো দ্বার-- সভা ভেঙে ফিরে চলে যাও হৃদয় আমার। তোমরা যা আশা করেছিলে নারিনু পুরাতে-- কে জানিত ছিঁড়ে যাবে তার গীত না ফুরাতে। ভেবেছিনু ঢেলে দিব মন, প্লাবন করিব দশদিশি-- পুষ্পগন্ধে আনন্দে মিশিয়া পূর্ণ হবে পূর্ণিমার নিশি। ভেবেছিনু ঘিরিয়া বসিবে তোমরা সকলে, গীতশেষে হেসে ভালোবেসে মালা দিবে গলে, শেষ করে যাব সব কথা সকল কাহিনী-- মাঝখানে ছিঁড়ে যাবে তার সে কথা ভাবি নি। আজি হতে সবে দয়া করে ভুলে যাও, ঘরে যাও চলে-- করিয়ো না মোরে অপরাধী মাঝখানে থামিলাম ব'লে। আমি চাহি আজি রজনীতে নীরব নির্জন ভূমিতলে ঘুমায়ে পড়িতে স্তব্ধ অচেতন-- খ্যাতিহীন শান্তি চাহি আমি স্নিগ্ধ অন্ধকার। সাঙ্গ না হইতে সব গান ছিন্ন হল তার।
আজ এই দিনের শেষে সন্ধ্যা যে ওই মানিকখানি পরেছিল চিকন কালো কেশে গেঁথে নিলেম তারে এই তো আমার বিনিসুতার গোপন গলার হারে। চক্রবাকের নিদ্রানীরব বিজন পদ্মাতীরে এই সে সন্ধ্যা ছুঁইয়ে গেল আমার নতশিরে নির্মাল্য তোমার আকাশ হয়ে পার; ওই যে মরি মরি তরঙ্গহীন স্রোতের 'পরে ভাসিয়ে দিল তারার ছায়াতরী; ওই যে সে তার সোনার চেলি দিল মেলি রাতের আঙিনায় ঘুমে অলস কায়; ওই যে শেষে সপ্তঋষির ছায়াপথে কালো ঘোড়ার রথে উড়িয়ে দিয়ে আগুন-ধূলি নিল সে বিদায়; একটি কেবল করুণ পরশ রেখে গেল একটি কবির ভালে; তোমার ওই অনন্ত মাঝে এমন সন্ধ্যা হয় নি কোনোকালে, আর হবে না কভু। এমনি করেই প্রভু এক নিমেষের পত্রপুটে ভরি চিরকালের ধনটি তোমার ক্ষণকালে লও যে নূতন করি।