প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর, তুমি মোরে দাও কথা তুমি মোরে দাও সুর। তুমি যদি থাক মনে বিকচ কমলাসনে, তুমি যদি কর প্রাণ তব প্রেমে পরিপূর-- প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর। তুমি যদি শোন গান আমার সমুখে থাকি, সুধা যদি করে দান তোমার উদার আঁখি, তুমি যদি দুখ-'পরে রাখ হাত স্নেহভরে, তুমি যদি সুখ হতে দম্ভ করহ দূর-- প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর।
প্রথম তোমাকে দেখেছি তোমার বোনের বিয়ের বাসরে নিমন্ত্রণের আসরে। সেদিন তখনো দেখেও তোমাকে দেখি নি, তুমি যেন ছিলে সূক্ষ্মরেখিণী ছবির মতো-- পেন্সিলে-আঁকা ঝাপসা ধোঁয়াটে লাইনে চেহারার ঠিক ভিতর দিকের সন্ধানটুকু পাই নে। নিজের মনের রঙ মেলাবার বাটিতে চাঁপালি খড়ির মাটিতে গোলাপি খড়ির রঙ হয় নি যে গোলা, সোনালি রঙের মোড়ক হয় নি খোলা। দিনে দিনে শেষে সময় এসেছে আগিয়ে, তোমার ছবিতে আমারি মনের রঙ যে দিয়েছি লাগিয়ে। বিধাতা তোমাকে সৃষ্টি করতে এসে আনমনা হয়ে শেষে কেবল তোমার ছায়া রচে দিয়ে, ভুলে ফেলে গিয়েছেন-- শুরু করেন নি কায়া। যদি শেষ করে দিতেন, হয়তো হত সে তিলোত্তমা, একেবারে নিরুপমা। যত রাজ্যের যত কবি তাকে ছন্দের ঘের দিয়ে আপন বুলিটি শিখিয়ে করত কাব্যের পোষা টিয়ে। আমার মনের স্বপ্নে তোমাকে যেমনি দিয়েছি দেহ অমনি তখন নাগাল পায় না সাহিত্যিকেরা কেহ। আমার দৃষ্টি তোমার সৃষ্টি হয়ে গেল একাকার। মাঝখান থেকে বিশ্বপতির ঘুচে গেল অধিকার। তুমি যে কেমন আমিই কেবল জানি, কোনো সাধারণ বাণী লাগে না কোনোই কাজে। কেবল তোমার নাম ধ'রে মাঝে-মাঝে অসময়ে দিই ডাক, কোনো প্রয়োজন থাক্ বা নাই-বা থাক্। অমনি তখনি কাঠিতে-জড়ানো উলে হাত কেঁপে গিয়ে গুন্তিতে যাও ভুলে। কোনো কথা আর নাই কোনো অভিধানে যার এত বড়ো মানে।
শিশুকালের থেকে আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে। দিন কাটত কোণের ঘরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা কাছের দিকে সর্বদা মুখ-ফেরা; তাই সুদূরের পিপাসাতে অতৃপ্ত মন তপ্ত ছিল। লুকিয়ে যেতেম ছাতে, চুরি করতেম আকাশভরা সোনার বরন ছুটি, নীল অমৃতে ডুবিয়ে নিতেম ব্যাকুল চক্ষু দুটি। দুপুর রৌদ্রে সুদূর শূন্যে আর কোনো নেই পাখি, কেবল একটি সঙ্গীবিহীন চিল উড়ে যায় ডাকি নীল অদৃশ্যপানে; আকাশপ্রিয় পাখি ওকে আমার হৃদয় জানে। স্তব্ধ ডানা প্রখর আলোর বুকে যেন সে কোন্ যোগীর ধেয়ান মুক্তি-অভিমুখে। তীক্ষ্ণ তীব্র সুর সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্ম হয়ে দূরের হতে দূর ভেদ করে যায় চলে বৈরাগী ঐ পাখির ভাষা মন কাঁপিয়ে তোলে। আলোর সঙ্গে আকাশ যেথায় এক হয়ে যায় মিলে শুভ্রে এবং নীলে তীর্থ আমার জেনেছি সেইখানে অতল নীরবতার মাঝে অবগাহনস্নানে। আবার যখন ঝঞ্ঝা, যেন প্রকাণ্ড এক চিল এক নিমেষে ছোঁ মেরে নেয় সব আকাশের নীল, দিকে দিকে ঝাপটে বেড়ায় স্পর্ধাবেগের ডানা, মানতে কোথাও চায় না কারো মানা, বারে বারে তড়িৎশিখার চঞ্চু-আঘাত হানে অদৃশ্য কোন্ পিঞ্জরটার কালো নিষেধপানে, আকাশে আর ঝড়ে আমার মনে সব-হারানো ছুটির মূর্তি গড়ে। তাই তো খবর পাই-- শান্তি সেও মুক্তি, আবার অশান্তিও তাই।