মাটির ছেলে হয়ে জন্ম, শহর নিল মোরে পোষ্যপুত্র ক'রে। ইঁটপাথরের আলিঙ্গনের রাখল আড়ালটিকে আমার চতুর্দিকে। বই প'ড়ে তাই পেতে হত ভ্রমণকারীর দেখা ছাদের উপর একা। কষ্ট তাদের, বিপদ তাদের, তাদের শঙ্কা যত লাগত নেশার মত। পথিক যে জন পথে পথেই পায় সে পৃথিবীকে, মুক্ত সে চৌদিকে। চলার ক্ষুধায় চলতে সে চায় দিনের পরে দিনে অচেনাকেই চিনে। লড়াই ক'রে দেশ করে জয়, বহায় রক্তধারা, ভূপতি নয় তারা। পলে পলে পার যারা হয় মাটির পরে মাটি প্রত্যেক পদ হাঁটি-- নাইকো সেপাই, নাইকো কামান, জয়পতাকা নাহি-- আপন বোঝা বাহি অপথেও পথ পেয়েছে, অজানাতে জানা, মানে নাইকো মানা-- মরু তাদের, মেরু তাদের, গিরি অভ্রভেদী তাদের বিজয়বেদী। সবার চেয়ে মানুষ ভীষণ; সেই মানুষের ভয় ব্যাঘাত তাদের নয়। তারাই ভূমির বরপুত্র, তাদের ডেকে কই, তোমরা পৃথ্বীজয়ী।
কে আমার ভাষাহীন অন্তরে চিত্তের মেঘলোকে সন্তরে, বক্ষের কাছে থাকে তবুও সে রয় দূরে, থাকে অশ্রুত সুরে। ভাবি বসে, গাব আমি তারই গান-- চুপ করে থাকি সারা দিনমান, অকথিত আবেগের ব্যথা সই। মন বলে, কথা কই কথা কই! চঞ্চল শোণিতে যে সত্তার ক্রন্দন ধ্বনিতেছে অর্থ কী জানি তাহা, আদিতম আদিমের বাণী তাহা। ভেদ করি ঝঞ্ঝার আলোড়ন ছেদ করি বাষ্পের আবরণ চুম্বিল ধরাতল যে আলোক, স্বর্গের সে বালক কানে তার বলে গেছে যে কথাটি তারই স্মৃতি আজো ধরণীর মাটি দিকে দিকে বিকাশিছে ঘাসে ঘাসে-- তারই পানে চেয়ে চেয়ে সেই সুর কানে আসে। প্রাণের প্রথমতম কম্পন অশথের মজ্জায় করিতেছে বিচরণ, তারই সেই ঝংকার ধ্বনিহীন-- আকাশের বক্ষেতে কেঁপে ওঠে নিশিদিন; মোর শিরাতন্তুতে বাজে তাই; সুগভীর চেতনার মাঝে তাই নর্তন জেগে ওঠে অদৃশ্য ভঙ্গিতে অরণ্যমর্মর-সংগীতে। ওই তরু ওই লতা ওরা সবে মুখরিত কুসুমে ও পল্লবে-- সেই মহাবাণীময় গহনমৌনতলে নির্বাক স্থলে জলে শুনি আদি-ওংকার, শুনি মূক গুঞ্জন অগোচর চেতনার। ধরণীর ধূলি হতে তারার সীমার কাছে কথাহারা যে ভুবন ব্যাপিয়াছে তার মাঝে নিই স্থান, চেয়ে-থাকা দুই চোখে বাজে ধ্বনিহীন গান।