আমি অধম অবিশ্বাসী, এ পাপমুখে সাজে না যে 'তোমায় আমি ভালোবাসি'। গুণের অভিমানে মেতে আর চাহি না আদর পেতে, কঠিন ধুলায় বসে এবার চরণসেবার অভিলাষী। হৃদয় যদি জ্বলে, তারে জ্বলিতে দাও, জ্বলিতে দাও। ঘুরব না আর আপন ছায়ায়, কাঁদব না আর আপন মায়ায়-- তোমার পানে রাখব ধরে প্রাণের অচল হাসি।
পথের নেশা আমায় লেগেছিল, পথ আমারে দিয়েছিল ডাক-- সূর্য তখন পূর্বগগনমূলে, নৌকা তখন বাঁধা নদীর কূলে, শিশির তখন শুকায় নিকো ফুলে, শিবালয়ে উঠল বেজে শাঁখ। পথের নেশা তখন লেগেছিল, পথ আমারে দিয়েছিল ডাক। আঁকাবাঁকা রাঙা মাটির লেখা ঘরছাড়া ওই নানা দেশের পথ-- প্রভাত-কালে অপার-পানে চেয়ে কী মোহগান উঠতেছিল গেয়ে, উদার সুরে ফেলতেছিল ছেয়ে বহুদূরের অরণ্য পর্বত। নানা দিনের নানা-পথিক-চলা ঘরছাড়া ওই নানা দেশের পথ। ভাবি নাইকো কেন কিসের লাগি ছুটে চলে এলেম পথের 'পরে। নিত্য কেবল এগিয়ে চলার সুখ, বাহির হওয়ার অনন্ত কৌতুক, প্রতি পদেই অন্তর উৎসুক অজানা কোন্ নিরুদ্দেশের তরে। ভোরের বেলা দুয়ার খুলে দিয়ে বাহির হয়ে এলেম পথের 'পরে। বেলা এখন অনেক হয়ে গেছে, পেরিয়ে চলে এলেম বহু দূর। ভেবেছিলেম পথের বাঁকে বাঁকে নব নব ভাগ্য আমায় ডাকে, হঠাৎ যেন দেখতে পাব কাকে, শুনতে যেন পাব নূতন সুর। তার পরে তো অনেক বেলা হল, পেরিয়ে চলে এলেম বহু দূর। অনেক দেখে ক্লান্ত এখন প্রাণ, ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশা। এখন কেবল একটি পেলেই বাঁচি, এসেছি তাই ঘাটের কাছাকাছি-- এখন শুধু আকুল মনে যাচি তোমার পারে খেয়ার তরী ভাসা। জেনেছি আজ চলেছি কার লাগি ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশা।
শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ চৌধুরী কল্যাণীয়েষু তখন আমার আয়ুর তরণী যৌবনের ঘাট গেছে পেরিয়ে। যে-সব কাজ প্রবীণকে প্রাজ্ঞকে মানায় তাই নিয়ে পাকা করছিলেম পাকা চুলের মর্যাদা। এমন সময়ে আমাকে ডাক দিলে তোমার সবুজপত্রের আসরে। আমার প্রাণে এনে দিলে পিছুডাক, খবর দিলে নবীনের দরবারে আমার ছুটি মেলেনি। দ্বিধার মধ্যে মুখ ফিরালেম পেরিয়ে-আসা পিছনের দিকে। পর্যাপ্ত তারুণ্যের পরিপূর্ণ মূর্তি দেখা দিল আমার চোখের সম্মুখে। ভরা যৌবনের দিনেও যৌবনের সংবাদ এমন জোয়ারের বেগে এসে লাগেনি আমার লেখনীতে। আমার মন বুঝল যৌবনকে না ছাড়ালে যৌবনকে যায় না পাওয়া।; আজ এসেছি জীবনের শেষ ঘাটে। পুবের দিক থেকে হাওয়ায় আসে পিছুডাক, দাঁড়াই মুখ ফিরিয়ে। আজ সামনে দেখা দিল এ জন্মের সমস্তটা। যাকে ছেড়ে এলেম তাকেই নিচ্ছি চিনে। সরে এসে দেখছি আমার এতকালের সুখদুঃখের ঐ সংসার, আর তার সঙ্গে সংসারকে পেরিয়ে কোন্ নিরুদ্দিষ্ট। ঋষি-কবি প্রাণপুরুষকে বলেছেন-- "ভুবন সৃষ্টি করেছ তোমার এক অর্ধেককে দিয়ে,-- বাকি আধখানা কোথায় তা কে জানে।" সেই একটি-আধখানা আমার মধ্যে আজ ঠেকেছে আপন প্রান্তরেখায়; দুইদিকে প্রসারিত দেখি দুই বিপুল নিঃশব্দ, দুই বিরাট আধখানা,-- তারি মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষকথা ব'লে যাব-- দুঃখ পেয়েছি অনেক, কিন্তু ভালো লেগেছে, ভালোবেসেছি।