আমার এ ভাগ্যরাজ্যে পুরানো কালের যে প্রদেশ, আয়ুহারাদের ভগ্নশেষ সেথা পড়ে আছে পূর্বদিগন্তের কাছে। নিঃশেষ করেছে মূল্য সংসারের হাটে, অনাবশ্যকের ভাঙা ঘাটে জীর্ণ দিন কাটাইছে তারা অর্থহারা। ভগ্ন গৃহে লগ্ন ঐ অর্ধেক প্রাচীর; আশাহীন পূর্ব আসক্তির কাঙাল শিকড়জাল বৃথা আঁকড়িয়া ধরে প্রাণপণে বর্তমান কাল। আকাশে তাকায় শিলালেখ, তাহার প্রত্যেক অস্পষ্ট অক্ষর আজ পাশের অক্ষরে ক্লান্ত সুরে প্রশ্ন করে, "আরো কি রয়েছে বাকি কোনো কথা, শেষ হয়ে যায় নি বারতা।" এ আমার ভাগ্যরাজ্যে অন্যত্র হোথায় দিগন্তরে অসংলগ্ন ভিত্তি-'পরে করে আছে চুপ অসমাপ্ত আকাঙক্ষার অসম্পূর্ণ রূপ। অকথিত বাণীর ইঙ্গিতে চারিভিতে নীরবতা-উৎকণ্ঠিত মুখ রয়েছে উৎসুক। একদা যে যাত্রীদের সংকল্পে ঘটেছে অপঘাত, অন্য পথে গেছে অকস্মাৎ, তাদের চকিত আশা, স্থকিত চলার স্তব্ধ ভাষা জানায়, হয় নি চলা সারা-- দুরাশার দূরতীর্থ আজো নিত্য করিছে ইশারা। আজিও কালের সভা-মাঝে তাদের প্রথম সাজে পড়ে নাই জীর্ণতার দাগ, লক্ষ্যচ্যুত কামনায় রয়েছে আদিম রক্তরাগ। কিছু শেষ করা হয় নাই, হেরো, তাই সময় যে পেল না নবীন কোনোদিন পুরাতন হতে-- শৈবালে ঢাকে নি তারে বাঁধা-পড়া ঘাটে-লাগা স্রোতে; স্মৃতির বেদনা কিছু, কিছু পরিতাপ, কিছু অপ্রাপ্তির অভিশাপ তারে নিত্য রেখেছে উজ্জ্বল; না দেয় নীরস হতে মজ্জাগত গুপ্ত অশ্রুজল। যাত্রাপথ-পাশে আছ তুমি আধো-ঢাকা ঘাসে-- পাথরে খুদিতেছিনু, হে মূর্তি, তোমারে কোন্ ক্ষণে কিসের কল্পনে। অপূর্ণ তোমার কাছে পা না উত্তর। মনে যে কী ছিল মোর যেদিন ফুটিত তাহা শিল্পের সম্পূর্ণ সাধনাতে শেষ-রেখাপাতে, সেদিন তা জানিতাম আমি; তার আগে চেষ্টা গেছে থামি। সেই শেষ না-জানার নিত্য নিরুত্তরখানি মর্ম-মাঝে রয়েছে আমার; স্বপ্নে তার প্রতিবিম্ব ফেলি সচকিত আলোকের কটাক্ষে সে করিতেছে কেলি।
ভালোবেসে মন বললে-- "আমার সব রাজত্ব দিলেম তোমাকে।" অবুঝ ইচ্ছাটা করলে অত্যুক্তি; দিতে পারবে কেন? সবটার নাগাল পাব কেমন ক'রে? ও যে একটা মহাদেশ, সাত সমুদ্রে বিচ্ছিন্ন। ওখানে বহুদূর নিয়ে একা বিরাজ করছে নির্বাক্ অনতিক্রমণীয়। তার মাথা উঠেছে মেঘে-ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায়, তার পা নেমেছে আঁধারে-ঢাকা গহ্বরে। এ যেন অগম্য গ্রহ এই আমার সত্তা, বাষ্প-আবরণে ফাঁক পড়েছে কোণে কোণে, দুরবীনের সন্ধান সেইটুকুতেই। যাকে বলতে পারি আমার সবটা, তার নাম দেওয়া হয়নি, তার নকশা শেষ হবে কবে? তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ব্যবহারের সম্পর্ক হবে কার? নামটা রয়েছে যে-পরিচয়টুকু নিয়ে, টুকরো-জোড়া দেওয়া তার রূপ, অনাবিষ্কৃতের প্রান্ত থেকে সংগ্রহ-করা। চারিদিকে ব্যর্থ ও সার্থক কামনার আলোয় ছায়ায় বিকীর্ণ আকাশ। সেখান থেকে নানা বেদনার রঙিন ছায়া নামে চিত্তভূমিতে; হাওয়ায় লাগে শীত বসন্তের ছোঁওয়া; সেই অদৃশ্য চঞ্চল লীলা কার কাছেই বা স্পষ্ট হল? ভাষার অঞ্জলিতে কে ধরতে পারে তাকে? জীবনভূমির এক প্রান্ত দৃঢ় হয়েছে কর্মবৈচিত্র৻ের বন্ধুরতায়, আর একপ্রান্তে অচরিতার্থ সাধনা বাষ্প হয়ে মেঘায়িত হল শূন্যে, মরীচিকা হয়ে আঁকছে ছবি। এই ব্যক্তিজগৎ মানবলোকে দেখা দিল জন্মমৃত্যুর সংকীর্ণ সংগমস্থলে। তার আলোকহীন প্রদেশে বৃহৎ অগোচরতায় পুঞ্জিত আছে আত্মবিস্মৃত শক্তি, মূল্য পায়নি এমন মহিমা, অনঙ্কুরিত সফলতার বীজ মাটির তলায়। সেখানে আছে ভীরুর লজ্জা, প্রচ্ছন্ন আত্মাবমাননা, অখ্যাত ইতিহাস, আছে আত্মাভিমানের ছদ্মবেশের বহু উপকরণ,-- সেখানে নিগূঢ় নিবিড় কালিমা অপেক্ষা করছে মৃত্যুর হাতের মার্জনা। এই অপরিণত অপ্রকাশিত আমি, এ কার জন্যে, এ কিসের জন্যে? যা নিয়ে এল কত সূচনা, কত ব্যঞ্জনা, বহু বেদনায় বাঁধা হতে চলল যার ভাষা, পৌঁছল না যা বাণীতে, তার ধ্বংস হবে অকস্মাৎ নিরর্থকতার অতলে, সইবে না সৃষ্টির এই ছেলেমানুষি। অপ্রকাশের পর্দা টেনেই কাজ করেন গুণী; ফুল থাকে কুঁড়ির অবগুণ্ঠনে, শিল্পী আড়ালে রাখেন অসমাপ্ত শিল্পপ্রয়াসকে; কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায়, নিষেধ আছে সমস্তটা দেখতে পাওয়ার পথে। আমাতে তাঁর ধ্যান সম্পূর্ণ হয়নি, তাই আমাকে বেষ্টন ক'রে এতখানি নিবিড় নিস্তব্ধতা। তাই আমি অপ্রাপ্য, আমি অচেনা; অজানার ঘেরের মধ্যে এ সৃষ্টি রয়েছে তাঁরি হাতে, কারো চোখের সামনে ধরবার সময় আসেনি, সবাই রইল দূরে,-- যারা বললে, "জানি", তারা জানল না।