আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো। সব দুখশোক সার্থক হোক লভিয়া তোমারি আলো। কোণে কোণে যত লুকানো আঁধার মরুক ধন্য হয়ে, তোমারি পুণ্য আলোকে বসিয়া প্রিয়জনে বাসি ভালো। আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো। পরশমণির প্রদীপ তোমার অচপল তার জ্যোতি, সোনা করে নিক পলকে আমার সব কলঙ্ক কালো। আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো। আমি যত দীপ জ্বালি শুধু তার জ্বালা আর শুধু কালি, আমার ঘরে দুয়ারে শিয়রে তোমারি কিরণ ঢালো। আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো।
ছোটো কাঠের সিঙ্গি আমার ছিল ছেলেবেলায়, সেটা নিয়ে গর্ব ছিল বীরপুরুষি খেলায়। গলায় বাঁধা রাঙা ফিতের দড়ি, চিনেমাটির ব্যাঙ বেড়াত পিঠের উপর চড়ি। ব্যাঙটা যখন পড়ে যেত ধম্কে দিতেম কষে, কাঠের সিঙ্গি ভয়ে পড়ত বসে। গাঁ গাঁ করে উঠছে বুঝি, যেমনি হত মনে, "চুপ করো" যেই ধম্কানো আর চম্কাত সেইখনে। আমার রাজ্যে আর যা থাকুক সিংহভয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না কখ্খোনো। মাংস ব'লে মাটির ঢেলা দিতেম ভাঁড়ের 'পরে, আপত্তি ও করত না তার তরে। বুঝিয়ে দিতেম, গোপাল যেমন সুবোধ সবার চেয়ে তেমনি সুবোধ হওয়া তো চাই যা দেব তাই খেয়ে। ইতিহাসে এমন শাসন করে নি কেউ পাঠ, দিবানিশি কাঠের সিঙ্গি ভয়েই ছিল কাঠ। খুদি কইত মিছিমিছি, "ভয় করছে, দাদা।" আমি বলতেম, "আমি আছি, থামাও তোমার কাঁদা-- যদি তোমায় খেয়েই ফেলে এমনি দেব মার দু চক্ষে ও দেখবে অন্ধকার।" মেজ্দিদি আর ছোড়্দিদিদের খেলা পুতুল নিয়ে, কথায় কথায় দিচ্ছে তাদের বিয়ে নেমন্তন্ন করত যখন যেতুম বটে খেতে, কিন্তু তাদের খেলার পানে চাইনি কটাক্ষেতে। পুরুষ আমি, সিঙ্গিমামা নত পায়ের কাছে, এমন খেলার সাহস বলো ক'জন মেয়ের আছে।
তোমারে দিব না দোষ। জানি মোর ভাগ্যের ভ্রূকুটি, ক্ষুদ্র এই সংসারের যত ক্ষত, যত তার ত্রুটি, যত ব্যথা আঘাত করিছে তব পরম সত্তারে অহরহ। জানি যে তুমি তো নাই ছাড়ায়ে আমারে নির্লিপ্ত সুদূর স্বর্গে। আমি মোর তোমাতে বিরাজে; দেওয়া-নেওয়া নিরন্তর প্রবাহিত তুমি-আমি-মাঝে দুর্গম বাধারে অতিক্রমি। আমার সকল ভার রাত্রিদিন রয়েছে তোমারি 'পরে, আমার সংসার সে শুধু আমারি নহে। তাই ভাবি এই ভার মোর যেন লঘু করি নিজবলে, জটিল বন্ধনডোর একে একে ছিন্ন করি যেন, মিলিয়া সহজ মিলে দ্বন্দ্বহীন বন্ধহীন বিচরণ করি এ নিখিলে না চেয়ে আপনা-পানে। অশান্তিরে করি দিলে দূর তোমাতে আমাতে মিলি ধ্বনিয়া উঠিবে এক সুর।