তল্লাস করেছিনু, হেথাকার বৃক্ষের চারি দিকে লক্ষণ মধু-দুর্ভিক্ষের। মৌমাছি বলবান পাহাড়ের ঠাণ্ডার, সেখানেও সম্প্রতি ক্ষীণ মধুভাণ্ডার-- হেন দুঃসংবাদ পাওয়া গেছে চিঠিতে। এ বছর বৃথা যাবে মধুলোভ মিটিতে। তবু কাল মধু-লাগি করেছিনু দরবার, আজ ভাবি অর্থ কি আছে দাবি করবার। মৌচাক-রচনায় সুনিপুণ যাহারা তুমি শুধু ভেদ কর তাহাদের পাহারা। মৌমাছি কৃপণতা করে যদি গোড়াতেই, জাস্তি না মেলে তবু খুশি রব থোড়াতেই। তাও কভু সম্ভব না হয় যদিস্যাৎ তা হলে তো অবশেষে শুধু গুড় দদ্যাৎ। অনুরোধ না মিটুক মনে নাহি ক্ষোভ নিয়ো, দুর্লভ হলে মধু গুড় হয় লোভনীয়। মধুতে যা ভিটামিন কম বটে গুড়ে তা, পূরণ করিয়া লব টমেটোয় জুড়ে তা। এইভাবে করা ভালো সন্তোষ-আশ্রয়-- কোনো অভাবেই কভু তার নাহি নাশ রয়।
আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা। তাই সে যখন তলব করে খাজানা মনে করি পালিয়ে গিয়ে দেব তারে ফাঁকি, রাখব দেনা বাকি। যেখানেতেই পালাই আমি গোপনে দিনে কাজের আড়ালেতে, রাতে স্বপনে, তলব তারি আসে নিশ্বাসে নিশ্বাসে। তাই জেনেছি, আমি তাহার নইকো অজানা। তাই জেনেছি ঋণের দায়ে ডাইনে বাঁয়ে বিকিয়ে বাসা নাইকো আমার ঠিকানা। তাই ভেবেছি জীবন-মরণে যা আছে সব চুকিয়ে দেব চরণে। তাহার পরে নিজের জোরে নিজেরি স্বত্বে মিলবে আমার আপন বাসা তাঁহার রাজত্বে।
আমার ঘরের আশেপাশে যে-সব আমার বোবা-বন্ধু আলোর প্রেমে মত্ত হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে তাদের ডাক আমার মনের মধ্যে পৌঁছল। তাদের ভাষা হচ্ছে জীবজগতের আদিভাষা, তার ইশারা গিয়ে পোঁছয় প্রাণের প্রথমতম স্তরে; হাজার হাজার বৎসরের ভুলে-যাওয়া ইতিহাসকে নাড়া দেয়; মনের মধ্যে যে-সাড়া ওঠে সেও ঐ গাছের ভাষায়-- তার কোনো স্পষ্ট মানে নেই, অথচ তার মধ্যে বহু যুগযুগান্তর গুনগুনিয়ে ওঠে। ঐ গাছগুলো বিশ্ববাউলের একতারা, ওদের মজ্জায় মজ্জায় সরল সুরের কাঁপন, ওদের ডালে ডালে পাতায় পাতায় একতালা ছন্দের নাচন। যদি নিস্তব্ধ হয়ে প্রাণ দিয়ে শুনি তা হলে অন্তরের মধ্যে মুক্তির বাণী এসে লাগে। মুক্তি সেই বিরাট প্রাণসমুদ্রের কূলে, যে-সমুদ্রের উপরের তলায় সুন্দরের লীলা রঙে রঙে তরঙ্গিত, আর গভীরতলে "শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্'। সেই সুন্দরের লীলায় লালসা নেই, আবেশ নেই, জড়তা নেই, কেবল পরমা শক্তির নিঃশেষ আনন্দের আন্দোলন। "এতস্যৈবানন্দস্য মাত্রাণি' দেখি ফুলে ফলে পল্লবে; তাতেই মুক্তির স্বাদ পাই, বিশ্বব্যাপী প্রাণের সঙ্গে প্রাণের নির্মল অবাধ মিলনের বাণী শুনি।