প্রদীপ যখন নিবেছিল, আঁধার যখন রাতি, দুয়ার যখন বন্ধ ছিল, ছিল না কেউ সাথি-- মনে হল অন্ধকারে কে এসেছে বাহির-দ্বারে, মনে হল শুনি যেন পায়ের ধ্বনি কার, রাতের হাওয়ায় বাজল বুঝি কঙ্কণঝংকার। বারেক শুধু মনে হল খুলি, দুয়ার খুলি। ক্ষণেক পরে ঘুমের ঘোরে কখন গেনু ভুলি। "কোন্ অতিথি দ্বারের কাছে একলা রাতে বসে আছে?' ক্ষণে ক্ষণে তন্দ্রা ভেঙে মন শুধাল যবে বলেছিলেম, "আর কিছু নয়, স্বপ্ন আমার হবে।' মাঝ-গগনে সপ্ত-ঋষি স্তব্ধ গভীর রাতে জানলা হতে আমায় যেন ডাকল ইশারাতে। মনে হল "শয়ন ফেলে, দিই-না কেন আলো জ্বেলে'-- আলসভরে রইনু শুয়ে হল না দীপ জ্বালা। প্রহর পরে কাটল প্রহর, বন্ধ রইল তালা। জাগল কখন দখিন-হাওয়া কাঁপল বনের হিয়া, স্বপ্নে কথা-কওয়ার মতো উঠল মর্মরিয়া। যুথীর গন্ধ ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছিল মোর বাতায়নে, শিহর দিয়ে গেল আমার সকল অঙ্গ চুমে। জেগে উঠে আবার কখন ভরল নয়ন ঘুমে। ভোরের তারা পুব-গগনে যখন হল গত বিদায়রাতির একটি ফোঁটা চোখের জলের মতো, হঠাৎ মনে হল তবে-- যেন কাহার করুণ রবে শিরীষ ফুলের গন্ধে আকুল বনের বীথি ব্যেপে শিশির-ভেজা তৃণগুলি উঠল কেঁপে কেঁপে। শয়ন ছেড়ে উঠে তখন খুলে দিলেম দ্বার-- হায় রে, ধুলায় বিছিয়ে গেছে যূথীর মালা কার। ওই যে দূরে, নয়ন নত, বনের ছায়ায় ছায়ার মতো মায়ার মতো মিলিয়ে গেল অরুণ-আলোয় মিশে, ওই বুঝি মোর বাহির-দ্বারের রাতের অতিথি সে। আজ হতে মোর ঘরের দুয়ার রাখব খুলে রাতে। প্রদীপখানি রইবে জ্বালা বাহির-জানালাতে। আজ হতে কার পরশ লাগি পথ তাকিয়ে রইব জাগি-- আর কোনোদিন আসবে না কি আমার পরান ছেয়ে যূথীর মালার গন্ধখানি রাতের বাতাস বেয়ে।
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ । তব ভুবনে তব ভবনে মোরে আরো আরো আরো দাও স্থান। আরো আলো আরো আলো এই নয়নে, প্রভু, ঢালো। সুরে সুরে বাঁশি পুরে তুমি আরো আরো আরো দাও তান। আরো বেদনা আরো বেদনা দাও মোরে আরো চেতনা। দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ। আরো প্রেমে আরো প্রেমে মোর আমি ডুবে যাক নেমে। সুধাধারে আপনারে তুমি আরো আরো আরো করো দান।
দামিনীর আঁখি কিবা ধরে জ্বল' জ্বল' বিভা কার তরে জ্বলিতেছে কেবা তাহা জানিবে? চারি দিকে খর ধার বাণ ছুটিতেছে তার কার-'পরে লক্ষ্য তার কেবা অনুমানিবে? তার চেয়ে নলিনীর আঁখিপানে চাহিতে কত ভালো লাগে তাহা কে পারিবে কহিতে? সদা তার আঁখি দুটি নিচু পাতে আছে ফুটি, সে আঁখি দেখে নি কেহ উঁচু পানে তুলিতে! যদি বা সে ভুলে কভু চায় কারো আননে, সহসা লাগিয়া জ্যোতি সে-জন বিস্ময়ে অতি চমকিয়া উঠে যেন স্বরগের কিরণে! ও আমার নলিনী লো, লাজমাখা নলিনী, অনেকেরি আঁখি-'পরে সৌন্দর্য বিরাজ করে, তোর আঁখি-'পরে প্রেম নলিনী লো নলিনী! দামিনীর দেহে রয় বসন কনকময় সে বসন অপসরী সৃজিয়াছে যতনে, যে গঠন যেই স্থান প্রকৃতি করেছে দান সে-সকল ফেলিয়াছে ঢাকিয়া সে বসনে। নলিনী বসন পানে দেখ দেখি চাহিয়া তার চেয়ে কত ভালো কে পারিবে কহিয়া? শিথিল অঞ্চল তার ওই দেখো চারি ধার স্বাধীন বায়ুর মতো উড়িতেছে বিমানে, যেথা যে গঠন আছে পূর্ণ ভাবে বিকাশিছে যেখানে যা উঁচু নিচু প্রকৃতির বিধানে! ও আমার নলিনী লো, সুকোমলা নলিনী মধুর রূপের ভাস তাই প্রকৃতির বাস, সেই বাস তোর দেহে নলিনী লো নলিনী! দামিনীর মুখ-আগে সদা রসিকতা জাগে, চারি ধারে জ্বলিতেছে খরধার বাণ সে, কিন্তু কে বলিতে পারে শুধু সে কি ধাঁধিবারে, নহে তা কি খর ধারে বিঁধিবারি মানসে? কিন্তু নলিনীর মনে মাথা রাখি সঙ্গোপনে ঘুমায়ে রয়েছে কিবা প্রণয়ের দেবতা। সুকোমল সে শয্যার অতি যা কঠিন ধার দলিত গোলাপ তাও আর কিছু নহে তা! ও আমার নলিনী লো, বিনয়িনী নলিনী রসিকতা তীব্র অতি নাই তার এত জ্যোতি তোমার নয়নে যত নলিনী লো নলিনী।