ওকালতি ব্যবসায়ে ক্রমশই তার জমেছিল একদিন মস্ত পসার। ভাগ্যটা ঘাটে ঘাটে কী করিয়া শেষে একদা জজের পদে ঠেকেছিল এসে। সদাই বাড়িতে তার মহা ধুমধাম, মুখে মুখে চারি দিকে রটে গেছে নাম। আজ সে তো কালীনাথ, আগে ছিল কেলে-- কাউকে ফাঁসিতে দেয় কাউকে বা জেলে। ক্লাসে ছিল একদিন একেবারে নিচু, মাস্টার বলতেন হবে নাকো কিছু। সব চেয়ে বোকারাম, সব চেয়ে হাঁদা-- দুষ্টুমি বুদ্ধিটা ছিল তার সাধা! ক্লাসে ছিল বিখ্যাত তারি দৃষ্টান্ত, সেই ইতিহাস তার সকলেই জানত। একদিন দেখা গেল ছুটির বিকালে ফলে ভরা আম গাছে একা বসি ডালে কামড় লাগাতেছিল পাকা পাকা আমে-- ডাক পাড়ে মাস্টার, কিছুতে না নামে। আম পেড়ে খেতে তোরে করেছি বারণ, সে কথা শুনিস নে যে বল্ কী কারণ। কালু বলে, পেড়ে আমি খাই নে তো তাই, ডালে ব'সে ব'সে ফল ক'ষে কামড়াই। মাস্টার বলে তারে, আয় তুই নাবি-- যত ফল খেয়েছিস তত চড় খাবি! কালু বলে, পালিয়াছি গুরুর আদেশ এই শাস্তিই যদি হয় তার শেষ, তা হলে তো ভালো নয় পড়াশুনা করা-- গুরুর বচন শুনে চড় খেয়ে মরা।
সে যেন খসিয়া-পড়া তারা, মর্তের প্রদীপে নিল মৃত্তিকার কারা। নগরে জনতামরু, সে যেন তাহারি মাঝে পথপ্রান্তে সঙ্গিহীন তরু, তারে ঢেকে আছে নিতি অরণ্যের সুগভীর স্মৃতি। সে যেন অকালে-ফোটা কুবলয়, শিশিরে কুণ্ঠিত হয়ে রয়। মন পাখা মেলিবারে চায়, চারি দিকে ঠেকে যায়, জানে না কিসের বাধা তার; অদৃষ্টের মায়াদুর্গদ্বার কোন্ রাজপুত্র এসে মন্ত্রবলে ভেঙে দেবে শেষে। আকাশে আলোতে নিমন্ত্রণ আসে যেন কোথা হতে, পথ রুদ্ধ চারি ধারে-- মুখ ফুটে বলিতে না পারে অলক্ষ্য কী আচ্ছাদনে কেন সে আবৃতা। সে যেন অশোকবনে-সীতা, চারি দিকে যারা আছে কেহ তার নহেক স্বকীয়; কে তারে পাঠাবে অঙ্গুরীয় বিচ্ছেদের অতল সমুদ্র-পারে। আঁখি তুলে তাই বারে বারে চেয়ে দেখে নিরুত্তর নিঃশব্দ গগনে। কোন্ দেব নিত্যনির্বাসনে পাঠাল তাহারে! স্বর্গের বীণার তারে সংগীতে কি করেছিল ভুল। মহেন্দ্রের-দেওয়া ফুল নৃত্যকালে খসে গেলে অন্যমনে দলেছিল কভু? আজও তবু মন্দারের গন্ধ যেন আছে তার বিষাদে জড়ানো, অধরে রয়েছে তার ম্লান-- সন্ধ্যার গোলাপ-সম-- মাঝখানে-ভেঙে-যাওয়া অমরার গীতি অনুপম। অদৃশ্য যে অশ্রুধারা আবিষ্ট করেছে তার চক্ষুতারা, তাহা দিব্য বেদনার করুণানির্ঝরী-- নাম কি ঝামরী।