মিছে তর্ক-- থাক্ তবে থাক্। কেন কাঁদি বুঝিতে পার না? তর্কেতে বুঝিবে তা কি? এই মুছিলাম আঁখি-- এ শুধু চোখের জল, এ নহে ভর্ৎসনা। আমি কি চেয়েছি পায়ে ধরে ওই তব আঁখি-তুলে চাওয়া, ওই কথা, ওই হাসি, ওই কাছে আসা-আসি, অলক দুলায়ে দিয়ে হেসে চলে যাওয়া? কেন আন বসন্তনিশীথে আঁখিভরা আবেশ বিহ্বল যদি বসন্তের শেষে শ্রান্তমনে ম্লান হেসে কাতরে খুঁজিতে হয় বিদায়ের ছল? আছি যেন সোনার খাঁচায় একখানি পোষ-মানা প্রাণ। এও কি বুঝাতে হয় প্রেম যদি নাহি রয় হাসিয়ে সোহাগ করা শুধু অপমান? মনে আছে সেই এক দিন প্রথম প্রণয় সে তখন। বিমল শরৎকাল, শুভ্র ক্ষীণ মেঘজাল, মৃদু শীতবায়ে স্নিগ্ধ রবির কিরণ। কাননে ফুটিত শেফালিকা, ফুলে ছেয়ে যেত তরুমূল। পরিপূর্ণ সুরধুনী, কুলুকুলু ধ্বনি শুনি, পরপারে বনশ্রেণী কুয়াশা-আকুল। আমা-পানে চাহিয়ে, তোমার আঁখিতে কাঁপিত প্রাণখানি। আনন্দে বিষাদে মেশা সেই নয়নের নেশা তুমি তো জান না তাহা, আমি তাহা জানি। সে কি মনে পড়িবে তোমার-- সহস্র লোকের মাঝখানে যেমনি দেখিতে মোরে কোন্ আকর্ষণডোরে আপনি আসিতে কাছে জ্ঞানে কি অজ্ঞানে। ক্ষণিক বিরহ-অবসানে নিবিড় মিলন-ব্যাকুলতা। মাঝে মাঝে সব ফেলি রহিতে নয়ন মেলি, আঁখিতে শুনিতে যেন হৃদয়ের কথা। কোনো কথা না রহিলে তবু শুধাইতে নিকটে আসিয়া। নীরবে চরণ ফেলে চুপিচুপি কাছে এলে কেমনে জানিতে পেতে, ফিরিতে হাসিয়া। আজ তুমি দেখেও দেখ না, সব কথা শুনিতে না পাও। কাছে আস আশা ক'রে আছি সারাদিন ধরে, আনমনে পাশ দিয়ে তুমি চলে যাও। দীপ জ্বেলে দীর্ঘ ছায়া লয়ে বসে আছি সন্ধ্যায় ক'জনা-- হয়তো বা কাছে এস, হয়তো বা দূরে বস, সে সকলি ইচ্ছাহীন দৈবের ঘটনা। এখন হয়েছে বহু কাজ, সতত রয়েছ অন্যমনে। সর্বত্র ছিলাম আমি-- এখন এসেছি নামি হৃদয়ের প্রান্তদেশে, ক্ষুদ্র গৃহকোণে। দিয়েছিলে হৃদয় যখন পেয়েছিলে প্রাণমন দেহ-- আজ সে হৃদয় নাই, যতই সোহাগ পাই শুধু তাই অবিশ্বাস বিষাদ সন্দেহ। জীবনের বসন্তে যাহারে ভালোবেসেছিলে একদিন, হায় হায় কী কুগ্রহ, আজ তারে অনুগ্রহ-- মিষ্ট কথা দিবে তারে গুটি দুই-তিন। অপবিত্র ও করপরশ সঙ্গে ওর হৃদয় নহিলে। মনে কি করেছ বঁধু, ও হাসি এতই মধু প্রেম না দিলেও চলে, শুধু হাসি দিলে। তুমিই তো দেখালে আমায় ( স্বপ্নেও ছিল না এত আশা ) প্রেমে দেয় কতখানি কোন্ হাসি কোন্ বাণী, হৃদয় বাসিতে পারে কত ভালোবাসা। তোমারি সে ভালোবাসা দিয়ে বুঝেছি আজি এ ভালোবাসা-- আজি এই দৃষ্টি হাসি, এ আদর রাশি রাশি, এই দূরে চলে-যাওয়া, এই কাছে আসা। বুক ফেটে কেন অশ্রু পড়ে তবুও কি বুঝিতে পার না? তর্কেতে বুঝিবে তা কি? এই মুছিলাম আঁখি-- এ শুধু চোখের জল, এ নহে ভর্ৎসনা।
থাক্ থাক্, কাজ নাই, বলিয়ো না কোনো কথা। চেয়ে দেখি, চলে যাই, মনে মনে গান গাই, মনে মনে রচি বসে কত সুখ কত ব্যথা। বিরহী পাখির প্রায় অজানা কানন-ছায় উড়িয়া বেড়াক সদা হৃদয়ের কাতরতা-- তারে বাঁধিয়ো না ধরে, বলিয়ো না কোনো কথা। আঁখি দিয়ে যাহা বল সহসা আসিয়া কাছে সেই ভালো, থাক্ তাই, তার বেশি কাজ নাই, কথা দিয়ে বল যদি মোহ ভেঙে যায় পাছে। এত মৃদু, এত আধো, অশ্রুজলে বাধো-বাধো শরমে সভয়ে ম্লান এমন কি ভাষা আছে? কথায় বোলো না তাহা আঁখি যাহা বলিয়াছে। তুমি হয়তো বা পারো আপনারে বুঝাইতে-- মনের সকল ভাষা প্রাণের সকল আশা পারো তুমি গেঁথে গেঁথে রচিতে মধুর গীতে। আমি তো জানি নে মোরে, দেখি নাই ভালো করে মনের সকল কথা পশিয়া আপন চিতে-- কী বুঝিতে কী বুঝেছি, কী বলব কী বলিতে। তবে থাক্। ওই শোনো, অন্ধকারে শোনা যায় জলের কল্লোলস্বর পল্লবের মরমর-- বাতাসের দীর্ঘশ্বাস শুনিয়া শিহরে কায়। আরো ঊর্ধ্বে দেখো চেয়ে অনন্ত আকাশ ছেয়ে কোটি কোটি মৌন দৃষ্টি তারকায়। প্রাণপণ দীপ্ত ভাষা জ্বলিয়া ফুটিতে চায়। এস চুপ করে শুনি এই বাণী স্তব্ধতার-- এই অরণ্যের তলে কানাকানি জলে স্থলে, মনে করি হল বলা ছিল যাহা বলিবার। হয়তো তোমার ভাবে তুমি এক বুঝে যাবে, আমার মনের মতো আমি বুঝে যাব আর-- নিশীথের কন্ঠ দিয়ে কথা হবে দুজনার। মনে করি দুটি তারা জগতের এক ধারে পাশাপাশি কাছাকাছি তৃষাতুর চেয়ে আছি, চিনিতেছি চিরযুগ, চিনি নাকো কেহ কারে। দিবসের কোলাহলে প্রতিদিন যাই চলে, ফিরে আসি রজনীর ভাষাহীন অন্ধকারে-- বুঝিবার নহে যাহা চাই তাহা বুঝিবারে। তোমার সাহস আছে, আমার সাহস নাই। এই-যে শঙ্কিত আলো অন্ধকারে জ্বলে ভালো, কে বলিতে পারে বলো যাহা চাও এ কি তাই। তবে ইহা থাক্ দূরে কল্পনার স্বপ্নপুরে, যার যাহা মনে লয় তাই মনে করে যাই-- এই চির-আবরণ খুলে ফেলে কাজ নাই। এস তবে বসি হেথা, বলিয়ো না কোনো কথা। নিশীথের অন্ধকারে ঘিরে দিক দুজনারে, আমাদের দুজনের জীবনের নীরবতা। দুজনের কোলে বুকে আঁধারে বাড়ুক সুখে দুজনের এক শিশু জনমের মনোব্যথা। তবে আর কাজ নাই, বলিয়ো না কোনো কথা।