হাটের ভিড়ের দিকে চেয়ে দেখি, হাজার হাজার মুখ হাজার হাজার ইতিহাস ঢাকা দিয়ে আসে যায় দিনের আলোয় রাতের আঁধারে। সব কথা তার কোনো কালে জানবে না কেউ, নিজেও জানে না কোনো লোক। মুখর আলাপ তার, উচ্চস্বরে কত আলোচনা, তারি অন্তস্তলে বিচিত্র বিপুল স্মৃতিবিস্মৃতির সৃষ্টিরাশি। সেখানে তো শব্দ নেই আলো নেই, বাইরের দৃষ্টি নেই, প্রবেশের পথ নেই কারো। সংখ্যাহীন মানুষের এই যে প্রচ্ছন্ন বাণী, অশ্রুত কাহিনী কোন্ আদিকাল হতে অন্তঃশীল অগণ্য ধারায় আঁধার মৃত্যুর মাঝে মেশে রাত্রিদিন, কী হল তাদের, কী এদের কাজ। হে প্রিয়, তোমার যতটুকু দেখেছি শুনেছি জেনেছি, পেয়েছি স্পর্শ করি' -- তার বহুশতগুণ অদৃশ্য অশ্রুত রহস্য কিসের জন্য বন্ধ হয়ে আছে, কার অপেক্ষায়। সে নিরালা ভবনের কুলুপ তোমার কাছে নেই। কার কাছে আছে তবে। কে মহা-অপরিচিত যার অগোচর সভাতলে হে চেনা-অপরিচিত, তোমার আসন? সেই কি সবার চেয়ে জানে আমাদের অন্তরের অজানারে। সবার চেয়ে কি বড়ো তার ভালোবাসা যার শুভদৃষ্টি-কাছে অব্যক্ত করেছে অবগুণ্ঠন মোচন।
বাবা নাকি বই লেখে সব নিজে। কিছুই বোঝা যায় না লেখেন কী যে। সেদিন পড়ে শোনাচ্ছিলেন তোরে, বুঝেছিলি? -- বল্ মা সত্যি ক'রে। এমন লেখায় তবে বল্ দেখি কী হবে। তোর মুখে মা, যেমন কথা শুনি, তেমন কেন লেখেন নাকো উনি। ঠাকুরমা কি বাবাকে কক্খনো রাজার কথা শোনায় নিকো কোনো। সে-সব কথাগুলি গেছেন বুঝি ভুলি? স্নান করতে বেলা হল দেখে তুমি কেবল যাও মা, ডেকে ডেকে -- খাবার নিয়ে তুমি বসেই থাকো, সে কথা তাঁর মনেই থাকে নাকো। করেন সারা বেলা লেখা-লেখা খেলা। বাবার ঘরে আমি খেলতে গেলে তুমি আমায় বল, "দুষ্টু ছেলে!' বক আমায় গোল করলে পরে-- "দেখছিস নে লিখছে বাবা ঘরে!' বল্ তো, সত্যি বল্, লিখে কী হয় ফল। আমি যখন বাবার খাতা টেনে লিখি বসে দোয়াত কলম এনে-- ক খ গ ঘ ঙ হ য ব র, আমার বেলা কেন মা, রাগ কর। বাবা যখন লেখে কথা কও না দেখে। বড়ো বড়ো রুল-কাটা কাগজ নষ্ট বাবা করেন না কি রোজ। আমি যদি নৌকো করতে চাই অম্নি বল, নষ্ট করতে নাই। সাদা কাগজ কালো করলে বুঝি ভালো?