মোর গান এরা সব শৈবালের দল, যেথায় জন্মেছে সেথা আপনারে করে নি অচল। মূল নাই, ফুল আছে, শুধু পাতা আছে, আলোর আনন্দ নিয়ে জলের তরঙ্গে এরা নাচে। বাসা নাই, নাইকো সঞ্চয়, অজানা অতিথি এরা কবে আসে নাইকো নিশ্চয়। যেদিন-শ্রাবণ নামে দুর্নিবার মেঘে, দুই কূল ডোবে স্রোতোবেগে, আমার শৈবালদল উদ্দাম চঞ্চল, বন্যার ধারায় পথ যে হারায় দেশে দেশে দিকে দিকে যায় ভেসে ভেসে।
ফুলদানি হতে একে একে আয়ুক্ষীণ গোলাপের পাপড়ি পড়িল ঝরে ঝরে। ফুলের জগতে মৃত্যুর বিকৃতি নাহি দেখি। শেষ ব্যঙ্গ নাহি হানে জীবনের পানে অসুন্দর। যে মাটির কাছে ঋণী আপনার ঘৃণা দিয়ে অশুচি করে না তারে ফুল, রূপে গন্ধে ফিরে দেয় ম্লান অবশেষ। বিদায়ের সকরুণ স্পর্শ আছে তাহে; নাইকো ভর্ৎসনা। জন্মদিনে মৃত্যুদিনে দোঁহে যবে করে মুখোমুখি দেখি যেন সে মিলনে পূর্বাচলে অস্তাচলে অবসন্ন দিবসের দৃষ্টিবিনিময়-- সমুজ্জ্বল গৌরবের প্রণত সুন্দর অবসান।
এই অজানা সাগরজলে বিকেলবেলার আলো লাগল আমার ভালো। কেউ দেখে কেউ নাই-বা দেখে, রাখবে না কেউ মনে, এমনতরো ফেলাছড়ার হিসাব কি কেউ গোনে। এই দেখে মোর ভরল বুকের কোণ; কোথা থেকে নামল রে সেই খেপা দিনের মন, যেদিন অকারণ হঠাৎ হাওয়ায় যৌবনেরি ঢেউ ছল্ছলিয়ে উঠত প্রাণে জানত না তা কেউ। লাগত আমায় আপন গানের নেশা অনাগত ফাগুন দিনের বেদন দিয়ে মেশা। সে গান যারা শুনত তারা আড়াল থেকে এসে আড়ালেতে লুকিয়ে যেত হেসে। হয়তো তাদের দেবার ছিল কিছু, আভাসে কেউ জানায় নি তা নয়ন করে নিচু। হয়তো তাদের সারাদিনের মাঝে পড়ত বাধা একবেলাকার কাজে। চমক-লাগা নিমেষগুলি সেই হয়তো বা কার মনে আছে, হয়তো মনে নেই। জ্যোৎস্নারাতে একলা ছাদের 'পরে উদার অনাদরে কাটত প্রহর লক্ষ্যবিহীন প্রাণে, মূল্যবিহীন গানে। মোর জীবনে বিশ্বজনের অজানা সেই দিন, বাজত তাহার বুকের মাঝে খামখেয়ালী বীন,-- যেমনতরো এই সাগরে নিত্য সোনায় নীলে রূপ হারানো রাধাশ্যামের দোলন দোঁহায় মিলে, যেমনতরো ছুটির দিনে এমনি বিকেলবেলা দেওয়া নেওয়ার নাই কোনো দায়, শুধু হওয়ার খেলা, অজানাতে ভাসিয়ে দেওয়া আলোছায়ার ভেলা।