এ কথা সে কথা মনে আসে, বর্ষাশেষে শরতের মেঘ যেন ফিরিছে বাতাসে। কাজের বাঁধনহারা শূন্যে করে মিছে আনাগোনা; কখনো রুপালি আঁকে, কখনো ফুটায়ে তোলে সোনা। অদ্ভুত মূর্তি সে রচে দিগন্তের কোণে, রেখার বদল করে পুনঃ পুনঃ যেন অন্যমনে। বাষ্পের সে শিল্পকাজ যেন আনন্দের অবহেলা-- কোনোখানে দায় নেই, তাই তার অর্থহীন খেলা। জাগার দায়িত্ব আছে, কাজ নিয়ে তাই ওঠাপড়া। ঘুমের তো দায় নেই, এলোমেলো স্বপ্ন তাই গড়া। মনের স্বপ্নের ধাত চাপা থাকে কাজের শাসনে, বসিতে পায় না ছুটি স্বরাজ-আসনে। যেমনি সে পায় ছাড়া খেয়ালে খেয়ালে করে ভিড়, স্বপ্ন দিয়ে রচে যেন উড়ুক্ষু পাখির কোন্ নীড়। আপনার মাঝে তাই পেতেছি প্রমাণ-- স্বপ্নের এ পাগলামি বিশ্বের আদিম উপাদান। তাহারে দমনে রাখে, ধ্রুব করে সৃষ্টির প্রণালী কর্তৃত্ব প্রচণ্ড বলশালী। শিল্পের নৈপুণ্য এই উদ্দামেরে শৃঙ্খলিত করা, অধরাকে ধরা।
তোমাকে পাঠালুম আমার লেখা এক-বই-ভরা কবিতা তারা সবাই ঘেঁষাঘেঁষি দেখা দিল একই সঙ্গে এক খাঁচায়। কাজেই আর সমস্ত পাবে, কেবল পাবে না তাদের মাঝখানের ফাঁকগুলোকে। যে অবকাশের নীল আকাশের আসরে একদিন নামল এসে কবিতা সেইটেই পড়ে রইল পিছনে। নিশীথ রাত্রের তারাগুলি ছিঁড়ে নিয়ে যদি হার গাঁথা যায় ঠেসে, বিশ্ব-বেনের দোকানে হয়তো সেটা বিকোয় মোটা দামে; তবু রসিকেরা বুঝতে পারে, যেন কমতি হল কিসের। যেটা কম পড়ল সেটা ফাঁকা আকাশ, তৌল করা যায় না তাকে, কিন্তু সেটা দরদ দিয়ে ভরা। মনে করো একটি গান উঠল জেগে নীরব সময়ের বুকের মাঝখানে একটি মাত্র নীলকান্তমণি-- তাকে কি দেখতে হবে গয়নার বাক্সের মধ্যে। বিক্রমাদিত্যের সভায় কবিতা শুনিয়েছেন কবি দিনে দিনে। ছাপাখানার দৈত্য তখন কবিতার সময়াকাশকে দেয় নি লেপে কালি মাখিয়ে। হাইড্রলিক জাঁতায় পেষা কাব্যপিণ্ড তলিয়ে যেত না গলায় এক-এক গ্রাসে, উপভোগটা পুরো অবসরে উঠত রসিয়ে। হায় রে, কানে শোনার কবিতাকে পরানো হল চোখে দেখার শিকল, কবিতার নির্বাসন হল লাইব্রেরি-লোকে; নিত্যকালের আদরের ধন পাব্লিশরের হাটে হল নাকাল। উপায় নেই, জটলা-পাকানোর যুগ এটা। কবিতাকে পাঠকের অভিসারে যেতে হয় পটল-ডাঙার অম্নিবাসে চড়ে। মন বলছে নিশ্বাস ফেলে-- আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে। তুমি যদি হতে বিক্রমাদিত্য আর আমি যদি হতেম-- কী হবে ব'লে। জন্মেছি ছাপার কালিদাস হয়ে। তোমরা আধুনিক মালবিকা কিনে পড় কবিতা আরাম-কেদারায় ব'সে। চোখ বুজে কান পেতে শোন না; শোনা হলে কবিকে পরিয়ে দাও না বেলফুলের মালা, দোকানে পাঁচ সিকে দিয়েই খালাস।