ওগো কে যায় বাঁশরি বাজায়ে। আমার ঘরে কেহ নাই যে। তারে মনে পড়ে যারে চাই যে॥ তার আকুল পরান বিরহের গান বাঁশি বুঝি গেল জানায়ে। আমি আমার কথা তারে জানাব কী করে, প্রাণ কাঁদে মোর তাই যে॥ কুসুমের মালা গাঁথা হল না, ধূলিতে পড়ে শুকায় রে, নিশি হয় ভোর, রজনীর চাঁদ মলিন মুখ লুকায় রে। সারা বিভাবরী কার পূজা করি যৌবন-ডালা সাজায়ে, ওই বাঁশি-স্বরে হায় প্রাণ নিয়ে যায়, আমি কেন থাকি হায় রে॥
আমি ভালোবাসি আমার নদীর বালুচর, শরৎকালে যে নির্জনে চকাচকীর ঘর। যেথায় ফুটে কাশ তটের চারি পাশ, শীতের দিনে বিদেশী সব হাঁসের বসবাস। কচ্ছপেরা ধীরে রৌদ্র পোহায় তীরে, দু-একখানি জেলের ডিঙি সন্ধেবেলায় ভিড়ে। আমি ভালোবাসি আমার নদীর বালুচর, শরৎকালে যে নির্জনে চকাচকীর ঘর। তুমি ভালোবাস তোমার ওই ও পারের বন, যেথায় গাঁথা ঘনচ্ছায়া পাতার আচ্ছাদন। যেথায় বাঁকা গলি নদীতে যায় চলি, দুই ধারে তার বেণুবনের শাখায় গলাগলি। সকাল-সন্ধেবেলা ঘাটে বধূর মেলা, ছেলের দলে ঘাটের জলে ভাসে ভাসায় ভেলা। তুমি ভালোবাস তোমার ওই ও পারের বন, যেথায় গাঁথা ঘনচ্ছায়া পাতার আচ্ছাদন। তোমার আমার মাঝখানেতে একটি বহে নদী, দুই তটেরে একই গান সে শোনায় নিরবধি। আমি শুনি শুয়ে বিজন বালু-ভুঁয়ে, তুমি শোন কাঁখের কলস ঘাটের 'পরে থুয়ে। তুমি তাহার গানে বোঝ একটা মানে, আমার কূলে আরেক অর্থ ঠেকে আমার কানে। তোমার আমার মাঝখানেতে একটি বহে নদী, দুই তটেরে একই গান সে শোনায় নিরবধি।
এই ঘরে আগে পাছে বোবা কালা বস্তু যত আছে দলবাঁধা এখানে সেখানে, কিছু চোখে পড়ে, কিছু পড়ে না মনের অবধানে। পিতলের ফুলদানিটাকে বহে নিয়ে টিপাইটা এক কোণে মুখ ঢেকে থাকে। ক্যাবিনেটে কী যে আছে কত, না জানারি মতো। পর্দায় পড়েছে ঢাকা সাসির দুখানা কাঁচ ভাঙা; আজ চেয়ে অকস্মাৎ দেখা গেল পর্দাখানা রাঙা-- চোখে পড়ে পড়েও না; জাজিমেতে আঁকে আলপনা সাতটা বেলার আলো সকালে রোদ্দুরে। সবুজ একটি শাড়ি ডুরে ঢেকে আছে ডেস্কোখানা; কবে তারে নিয়েছিনু বেছে, রঙ চোখে উঠেছিল নেচে, আজ যেন সে রঙের আগুনেতে পড়ে গেছে ছাই, আছে তবু ষোলো-আনা নাই। থাকে থাকে দেরাজের এলোমেলো ভরা আছে ঢের কাগজপত্তর নানামতো, ফেলে দিতে ভুলে যাই কত, জানি নে কী জানি কোন্ আছে দরকার। টেবিলে হেলানো ক্যালেণ্ডার, হঠাৎ ঠাহর হল আটই তারিখ। ল্যাভেণ্ডার শিশিভরা রোদ্দুরের রঙে। দিনরাত টিক্টিক্ করে ঘড়ি, চেয়ে দেখি কখনো দৈবাৎ। দেয়ালের কাছে আলমারিভরা বই আছে; ওরা বারো-আনা পরিচয়-অপেক্ষায় রয়েছে অজানা। ওই যে দেয়ালে ছবিগুলো হেথা হোথা, রেখেছিনু কোনো-এক কালে; আজ তারা ভুলে-যাওয়া, যেন ভূতে-পাওয়া, কার্পেটের ডিজাইন স্পষ্টভাষা বলেছিল একদিন; আজ অন্যরূপ, প্রায় তারা চুপ। আগেকার দিন আর আজিকার দিন পড়ে আছে হেথা হোথা একসাথে সম্বন্ধবিহীন। এইটুকু ঘর। কিছু বা আপন তার, অনেক কিছুই তার পর। টেবিলের ধারে তাই চোখ-বোজা অভ্যাসের পথ দিয়ে যাই। দেখি যারা অনেকটা স্পষ্ট দেখি নাকো। জানা অজানার মাঝে সরু এক চৈতন্যের সাঁকো, ক্ষণে ক্ষণে অন্যমনা তারি 'পরে চলে আনাগোনা। আয়না-ফ্রেমের তলে ছেলেবেলাকার ফোটোগ্রাফ কে রেখেছে, ফিকে হয়ে গেছে তার ছাপ। পাশাপাশি ছায়া আর ছবি। মনে ভাবি, আমি সেই রবি, স্পষ্ট আর অস্পষ্টের উপাদানে ঠাসা ঘরের মতন; ঝাপ্সা পুরানো ছেঁড়া ভাষা আসবাবগুলো যেন আছে অন্যমনে। সামনে রয়েছে কিছু, কিছু লুকিয়েছে কোণে কোণে। যাহা ফেলিবার ফেলে দিতে মনে নেই। ক্ষয় হয়ে আসে অর্থ তার যাহা আছে জমে। ক্রমে ক্রমে অতীতের দিনগুলি মুছে ফেলে অস্তিত্বের অধিকার। ছায়া তারা নূতনের মাঝে পথহারা; যে অক্ষরে লিপি তারা লিখিয়া পাঠায় বর্তমানে সে কেহ পড়িতে নাহি জানে।