আমার মনে একটুও নেই বৈকুন্ঠের আশা।-- ওইখানে মোর বাসা যে মাটিতে শিউরে ওঠে ঘাস, যার 'পরে ওই মন্ত্র পড়ে দক্ষিনে বাতাস। চিরদিনের আলোক-জ্বালা নীল আকাশের নীচে যাত্রা আমার নৃত্যপাগল নটরাজের পিছে। ফুল ফোটাবার যে রাগিণী বকুল শাখায় সাধা, নিষ্কারণে ওড়ার আবেগ চিলের পাখায় বাঁধা, সেই দিয়েছে রক্তে আমার ঢেউয়ের দোলাদুলি; স্বপ্নলোকে সেই উড়েছে সুরের পাখনা তুলি। দায়-ভোলা মোর মন মন্দে-ভালোয় সাদায়-কালোয় অঙ্কিত প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে গেছে দূর দিগন্ত-পানে আপন বাঁশির পথ-ভোলানো তানে। দেখা দিল দেহের অতীত কোন্ দেহ এই মোর ছিন্ন করি বস্তুবাঁধন-ডোর। শুধু কেবল বিপুল অনুভূতি, গভীর হতে বিচ্ছুরিত আনন্দময় দ্যুতি, শুধু কেবল গানেই ভাষা যার, পুষ্পিত ফাল্গুনের ছন্দে গন্ধে একাকার; নিমেষহারা চেয়ে-থাকার দূর অপারের মাঝে ইঙ্গিত যার বাজে। যে দেহেতে মিলিয়ে আছে অনেক ভোরের আলো, নাম-না-জানা অপূর্বেরে যার লেগেছে ভালো, যে দেহেতে রূপ নিয়েছে অনির্বচনীয় সকল প্রিয়ের মাঝখানে যে প্রিয়, পেরিয়ে মরণ সে মোর সঙ্গে যাবে-- কেবল রসে, কেবল সুরে, কেবল অনুভাবে।
সত্য মোর অবলিপ্ত সংসারের বিচিত্র প্রলেপে, বিবিধের বহু হস্তক্ষেপে, অযত্নে অনবধানে হারালো প্রথম রূপ,দেবতার আপন স্বাক্ষর লুপ্তপ্রায়-- ক্ষয়ক্ষীণ জ্যোতির্ময় আদিমূল্য তার। চতুষ্পথে দাঁড়াল সে ললাটে পণ্যের ছাপ নিয়ে আপনারে বিকাইতে-- অঙ্কিত হতেছে তার স্থান পথে-চলা সহস্রের পরীক্ষাচিহ্নিত তালিকায়। হেনকালে একদিন আলো-আঁধারের সন্ধিস্থলে আরতিশঙ্খের ধ্বনি যে লগ্নে বাজিল সিন্ধুপারে, মনে হল, মুহূর্তেই থেমে গেল সব বেচাকেনা, শান্ত হল আশাপ্রত্যাশার কোলাহল। মনে হল, পরের মুখের মূল্য হতে মুক্ত, সব চিহ্ন-মোছা অসজ্জিত আদিকৌলীন্যের শান্ত পরিচয় বহি যেতে হবে নীরবের ভাষাহীন সংগীতমন্দিরে একাকীর একতারা হাতে। আদিমসৃষ্টির যুগে প্রকাশের যে আনন্দ রূপ নিল আমার সত্তায় আজ ধূলিমগ্ন তাহা, নিদ্রাহারা রুগ্ণ বুভুক্ষার দীপধূমে কলঙ্কিত। তারে ফিরে নিয়ে চলিয়াছি মৃত্যু স্নানতীর্থতটে সেই আদি নির্ঝরতলায়। বুঝি এই যাত্রা মোর স্বপ্নের অরণ্যবীথিপারে পূর্ব ইতিহাস-ধৌত অকলঙ্ক প্রথমের পানে-- যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে কখনো বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয়হুংকারে, কখনো বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।