শব্দগুলি বোর্ডের উপর লিখিতে থাকিবে। এই শব্দযোগে ছোট ছোট বাক্য রচনা করিতে হইবে। শিক্ষক মহাশয় দেখিবেন যে বাক্যগুলির মধ্যে একটি সংলগ্ন চিন্তার ধারা রক্ষিত হয়
ইংরাজশাসন-বিদ্বেষী একদল লোক ক্রোধভরে বলেন-- দেখ দেখি ইংরাজের কি অন্যায় ! প্রাচীন ভারতবর্ষের বিদ্যাবুদ্ধি লইয়া তাহার সভ্যতা; ভারতবর্ষের বিষয় পাইয়া সে ধনী; অথচ সেই ভারতবর্ষের প্রতি তাহার কি অন্যায় ব্যবহার ! আমার বক্তব্য এই যে, তাহারা ত ঠিক উত্তরাধিকারীর মত কাজ করিতেছে । ভারতবর্ষের মুখাগ্নি করিতেছে,ভারতবর্ষের শ্রাদ্ধ করিতেছে, আরও কি চাও ! ভূত ভারতবর্ষ যখন মাঝে মাঝে স্থানে স্থানে উপদ্রব করিতেছিল, তখন বড় বড় কামান-গোলার পিন্ডদান করিয়া তাহাকে একেবারে শান্ত করিয়াছে তাহা ছাড়া শাস্ত্রে বলে, নিজের সন্তানদের প্রতিপালন করিয়া লোকে পিতৃঋণ হইতে মুক্ত হয় । চিত্রগুপ্তের ছোট-আদালত হইতে এ ঋণের জন্য ইংরাজের নামে বোধ করি কোনো কালে ওয়ারেন্ট্ বাহির হইবে না । যে দেশে,যেখানে চরিবার প্রশস্ত মাঠ পাইয়াছে, Jane Cow (Johan Bull-এর স্ত্রীলিঙ্গ) সেইখানেই নিজের সন্তানগুলিকে চরাইয়া ও পরের সন্তানগুলিকে গুঁতাইয়া বেড়াইতেছে । অতএব উত্তরাধিকারীর ও পূর্ব্বপুরুষের কর্ত্তব্য-সাধনে তাহাদের কোন প্রকার শৈথিল্য লক্ষিত হইতেছে না। তবে তোমার নালিশ কি লইয়া?
আত্মগঠন সকল দ্রব্যই যাহা-কিছু নিজের অনুকূল উপযোগী তাহাই আপন শক্তি-প্রভাবে চারি দিক হইতে আকর্ষণ করিতে থাকে, বাকী আর সকলের প্রতি তাহার তেমন ক্ষমতা নাই। নিজেকে যথাযোগ্য আকারে ব্যক্ত ও পরিপুষ্ট করিবার পক্ষে যে-সকল পদার্থ সর্ব্বাপেক্ষা উপযোগী উদ্ভিজ্জশক্তি কেবল তাহাই জল বায়ু মৃত্তিকা হইতে গ্রহণ করিতে পারে, আর কিছুই না। মানুষের জীবনীশক্তিও কিছুতেই আপনাকে উদ্ভিদ্শরীরের মধ্যে ব্যক্ত করিতে পারে না। সে নিজের চারি দিকে এমন সকল পদার্থই সঞ্চয় করিতে পারে যাহা তাহার নিজের প্রকাশের পক্ষে সর্ব্বাপেক্ষা অনুকূল। মনের মধ্যে একটা পাপের সঙ্কল্প তাহার চারি দিকে সহস্র পাপের সঙ্কল্প আকর্ষণ করিয়া আপনাকে আকারবদ্ধ করিয়া তুলে ও প্রতিদিন বৃহৎ হইতে থাকে। পুণ্যসঙ্কল্পও সেইরূপ। সজীবতার ইহাই লক্ষণ। আমরা যখন একটি প্রবন্ধ লিখি, তখন কিছু সেই প্রবন্ধের প্রত্যেক ভাব প্রত্যেক কথা ভাবিয়া লিখিতে বসি না। একটা মুখ্য সজীব ভাব যদি আমার মনে আবির্ভূত হয়, তবে সে নিজের শক্তি-প্রভাবে আপনার অনুকূল ভাব ও শব্দগুলি নিজের চারি দিকে গঠিত করিতে থাকে। আমি যে-সকল ভাব কোন-কালেও ভাবি নাই তাহাদিগকেও কোথা হইতে আকর্ষণ করিয়া আনে। এইরূপে সে একটি পরিপূর্ণ প্রবন্ধ-আকার ধারণ করিয়া আপনাকে আপনি মানুষ করিয়া তুলে। এই জন্য, প্রবন্ধের মর্ম্মস্থিত মুখ্য ভাবটি যত সজীব হয় প্রবন্ধ ততই ভাল হয়; নির্জ্জীব ভাব আপনাকে আপনি গড়িতে পারে না, বাহির হইতে তাহার কাঠামো গড়িয়া দিতে হয়। এই নিমিত্ত ভাল লেখা লেখকের পক্ষেও একটি শিক্ষা। তিনি যতই অগ্রসর হইতে থাকেন ততই নূতন জ্ঞান লাভ করিতে থাকেন।
কেনই বা থাকিবে ? তিনি নিজের কাছে নিজে সর্ব্বদাই সম্ভ্রমে নত হইয়া থাকেন । তাঁহার নিজের সহচর নিজেই । অত বড় সহচর দশের মধ্যে কোথায় মিলিবে ! প্রতিভা যখন মুহূর্ত্ত কালের জন্য অতিথি হইয়া এক জন কবিকে বীণা করিয়া তাঁহার তন্ত্রী হইতে সুর বাহির করিতে থাকে তখন তিনি নিজের সুর শুনিয়া নিজে মুগ্ধ হইয়া পড়েন । বাল্মীকি তাঁহার নিজের রচিত রামকে যেমন ভক্তি করিতেন এমন কোন ভক্ত করেন না এবং যতক্ষন তিনি রামের চরিত্র সৃজন করিতেছিলেন ততক্ষন তিনি নিজেই রাম হইয়াছিলেন ও তাঁহার নিজের মহান ভাবে নিজেই মোহিত হইয়া গিয়াছিলেন । এইরূপে যাঁহারা নিজেকে নিজেই ভক্তি করিতে পারেন, নিজের সাহচর্য্যে নিজে সুখ ভোগ করিতে পারেন, তাঁহাদিগকে আর দশ জনের হস্তে আত্মসমর্পণ করিতে হয় না । এক কথায় -- যাঁহারা একলা থাকেন তাঁহারা আর পরের সহিত মিশিবার অবসর পান না । ইহাকেই বলে অহঙ্কারবিবর্জ্জিত আত্মম্ভরিতা ।