এক গণিত লইয়া এত কথা যদি হইল তবে আরো একটা বলি; পাঠকেরা ধৈর্য্য সংগ্রহ করুন। পাটীগণিতের যোগ এবং গুণ সম্বন্ধে আমার বক্তব্য আছে। সংসারের খাতায় আমরা এক একটা সংখ্যা, আমাদের লইয়া অদৃষ্ট অঙ্ক কষিতেছে। কখন বা শ্রীযুক্ত বাবু ৬এর সহিত শ্রীমতী ৩এর যোগ হইতেছে, কখন বা শ্রীযুক্ত ১এর সহিত শ্রীমান ১/২এর বিয়োগ হইতেছে ইত্যাদি। দেখা যায়, এ সংসারে যোগ সর্ব্বদাই হয়, কিন্তু গুণ প্রায় হয় না। গুণ কাহাকে বলে? না, যোগের অপেক্ষা যাহাতে অধিক যোগ হয়। ৩এ ৩ যোগ করিলে ৬ হয়, ৩এ ৩গুণ করিলে ৯ হয়। অতএব দেখা যাইতেছে গুণ করিলে যতটা যোগ করা হয়, এমন যোগ করিলে হয় না। মনোগণিতশাস্ত্রে প্রাণে প্রাণে গুণে গুণে মিলকে গুণ বলে ও সামান্যতঃ মিলন হইলে যোগ বলে। সমান্যতঃ বিচ্ছেদ হইলে বিয়োগ বলে ও প্রাণে প্রাণে বিচ্ছেদ হইলে ভাগ বলে। বলা বাহুল্য গুণে যেমন সর্ব্বাপেক্ষা অধিক যোগ হয়, ভাগে তেমনি সর্ব্বাপেক্ষা অধিক বিয়োগ হয়। এমন-কি, আমার বিশ্বাস এই যে, অদৃষ্ট পাটীগণিতের যোগ বিয়োগ ও গুণ পর্য্যন্ত শিখিয়াছে, কিন্তু ভাগটা এখনো শিখে নাই, সেইটে কষিতে অত্যন্ত ভুল করে। মনে কর, ৩কে ২দিয়া গুণ করিয়া ৬ হইল। সেই ৬কে পুনর্ব্বার ২ দিয়া ভাগ কর, ৩ অবশিষ্ট থাকিবে। তেমনি রাধাকে শ্যাম দিয়া গুণ কর রাধাশ্যাম হইল; আবার রাধাশ্যামকে শ্যাম দিয়া ভাগ কর, রাধা অবশিষ্ট থাকা উচিত, কিন্তু তাহা থাকে না কেন? রাধারও অনেকটা চলিয়া যায় কেন? শ্যামের সহিত গুণ হইবার পূর্ব্বে রাধা যাহা ছিল, শ্যামের সহিত ভাগ হইবার পরেও রাধা কেন পুনশ্চ তাহাই হয় না? অদৃষ্টের এ কেমনতর অঙ্ক কষা! হিসাবের খাতায় এই দারুণ ভুলের দরুন ত কম লোকসান হয় না! প্রস্তাব-লেখক এইখানে একটি বিজ্ঞাপন দিতেছেন। একটি অত্যন্ত দুরূহ অঙ্ক কষিবার আছে, এ পর্য্যন্ত কেহ কষিতে পারে নাই । যে পাঠক কষিয়া দিতে পারিবেন তাঁহাকে পুরস্কার দিব। আমার এই হৃদয়টি একটি ভগ্নাংশ; আর একটি সংখ্যার সহিত গুণ করিয়া ইহা যিনি পূরণ করিয়া দিবেন তাঁহাকে আমার সর্ব্বস্ব পারিতোষিক দিব।
পাঠক-খরিদ্দার লেখক-ব্যাপারীর প্রতি-- "কেন হে, আজকাল তোমার এখানে তেমন ভাল ভাব পাওয়া যায় না কেন?" লেখক-- "মহাশয়, আমার এ ফল ফুলের দোকান। মিঠাই মণ্ডার নহে, যে, নিজের হাতে গড়িয়া দিব। আমার মাথার জমিতে কতকগুলো গাছ আছে। আপনি আমার সঙ্গে বন্দোবস্ত করিয়াছেন, আপনাকে নিয়মিত ফল ফুল যোগাইতে হইবে। কিন্তু ঠিক নিয়ম-অনুসারে ফল ফুল ফলেও না, ফুটেও না; কখন্ ফলে, কখন ফুটে বলিয়া অপেক্ষা করিয়া থাকিতে হয়। কিন্তু তাহা করিলে চলে না, আপনি প্রত্যহ তাগাদা করিতে থাকেন, কই হে , ফুল কই, ফল কই? ফল ধোঁয়া দিয়া বলপূর্ব্বক পাকাইতে হয়, কাজেই আপানারা গাছপাকা ভাবটি পান না। এমন একটা প্রবন্ধ তৈরি হয়, তাহার আঁঠির কাছটা হয়ত টক, খোসার কাছে হয়ত ঈষৎ মিষ্ট; তাহার এক জায়গায় হয়ত থল্থোলে, আর এক জায়গায় হয়ত কাঁচা শক্ত। ফুল ছিঁড়িয়া ফোটাইতে হয়; এমন একটা কবিতা তৈরি হয় যাহার ভালরূপ রঙ্ ধরে নাই, গন্ধ জন্মে নাই, পাপ্ড়িগুলি কোঁক্ড়ানো। রহিয়া বসিয়া কিছু করিতে পারি না, সমস্তই তাড়াতাড়ি করিতে হয়। দেখুন দেখি গাছে কত কুঁড়ি ধরিয়াছে! কি দুঃখ যে, গাছে রাখিয়া ফুটাইতে পারি না! আমাদের দেশীয় কন্যার পিতারা যেমন মেয়েকুঁড়ি গাছে রাখিতে পারেন না, ৮ বৎসরের কুঁড়িটিকে ছিঁড়িয়া বিবাহ দিয়া বলপূর্ব্বক ফুটাইয়া তুলেন ও বেচারীদের বিশ বৎসরের মধ্যে ঝরিয়া পড়িবার লক্ষণ প্রকাশিত হয়। আমার বলপূর্ব্বক-ফোটান' কবিতার কুঁড়িগুলিও দেখিতে দেখিতে ঝরিয়া পড়ে। কিন্তু ইহা অপেক্ষাও আমার আর একটা আপ্শোষ আছে; আমার যে কুঁড়িগুলি ফুটিল না সেগুলি যদি ফুটিত, যে মুকুলগুলি ঝরিয়া গেল তাহাতে যদি ফল ধরিত, তবে কি কীর্ত্তিই লাভ করিতাম!"
সত্যকে আংশিক ভাবে দেখিলে অনেক সময়ে তাহা মিথ্যার রূপান্তর ধারণ করে। এক পাশ হইতে একটা জিনিষকে দেখিয়া যাহা সহসা মনে হয় তাহা একপেশে সত্য, তাহা বাস্তবিক সত্য না হইতেও পারে। আবার অপর পক্ষেও একটা বলিবার কথা আছে। কেহ সত্যকে সর্ব্বতোভাবে দেখিতে পায় না। সত্যকে যথাসম্ভব সর্ব্বতোভাবে দেখিতে গেলে প্রথমে তাহাকে আংশিক ভাবে দেখিতে হইবে, তাহা ব্যতীত আমাদের আর গতি নাই। ইহা আমাদের অসম্পূর্ণতার ফল। আমরা কিছু একেবারেই একটা চারি-কোণা দ্রব্যের সবটা দেখিতে পাই না-- ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া খণ্ড খণ্ড করিয়া দেখিতে হয়। এই নিমিত্ত উচিত এই যে, যে যে-দিকটা দেখিয়াছে সে সেই দিকটাই সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করুক, অবশেষে সকলের কথা গাঁথিয়া একটা সম্পূর্ণ সত্য পাওয়া যাইবে। আমাদের এক-চোখো মন লইয়া সম্পূর্ণ সত্য জানিবার আর কোন উপায় নাই। আমরা একদল অন্ধ, আর সত্য একটি হস্তী। স্পর্শ করিয়া করিয়া সকলেই হস্তীর এক-একটি অংশের অধিক জানিতে পারি না। এই জন্যই কিছু দিন ধরিয়া হস্তীকে কেহ বা স্তম্ভ, কেহ বা সর্প, কেহ বা কুলা বলিয়া ঘোরতর বিবাদ করিয়া থাকি; অবশেষে সকলের কথা মিলাইয়া বিবাদ মিটাইয়া লই। আমি যে ভূমিকাচ্ছলে এতটা পুরাতন কথা বলিলাম, তাহার কারণ এই-- আমি জানাইতে চাই, একপেশে লেখার উপর আমার কিছু মাত্র বিরাগ নাই এবং আমার মতে, যাহারা একেবারে সত্যের চারি দিক দেখাইতে চায়, তাহারা কোন দিকই ভাল করিয়া দেখাইতে পারে না-- তাহারা কতকগুলি কথা বলিয়া যায়, কিন্তু একটা ছবি দেখাইতে পারে না। একটা উদাহরণ দিলেই আমার কথা বেশ স্পষ্ট হইবে। একটা ছবি আঁকিতে হইলে, যথার্থতঃ যে দ্রব্য যেরূপ ঠিক সেরূপ আঁকা উচিত নহে। যখন চিত্রকর নিকটের গাছ বড় করিয়া আঁকে ও দূরের গাছ ছোট করিয়া আঁকে, তখন তাহাতে এমন বুঝায় না যে বাস্তবিকই দূরের গাছগুলি আয়তনে ছোট। একজন যদি কোন ছবিতে সব গাছগুলি প্রায় সম-আয়তনে আঁকে, তবে তাহাতে সত্য বজায় থাকে বটে, কিন্তু সে ছবি আমাদের সত্য বলিয়া মনে হয় না-- অর্থাৎ তাহাতে সত্য আমাদের মনে অঙ্কিত হয় না। লেখার বিষয়েও তাহাই বলা যায়। আমি যে ভাবটা নিকটে দেখিতে পাই, সেই ভাবটাই যদি বড় করিয়া না আঁকি ও তাহার বিপরীত দিকের সীমান্ত যদি অনেকটা ক্ষুদ্র, অনেকটা ছায়াময়, অনেকটা অদৃশ্য করিয়া না দিই- তবে তাহাতে কোন উদ্দেশ্যই ভাল করিয়া সাধিত হয় না; না সমস্তটার ভাল ছবি পাওয়া যায়, না একাংশের ভাল ছবি পাওয়া য়ায়। এইজন্যই লেখক-চিত্রকরদিগকে পরামর্শ দেওয়া যায়, যে যে-ভাবটাকে কাছে দেখিতেছ তাহাই বড় করিয়া আঁক; ভাবিয়া চিন্তিয়া, বিচার করিয়া, সত্যের সহিত পরামর্শ করিয়া, ন্যায়কে বজায় রাখিবার জন্য তাহাকে খাট করিবার কোন আবশ্যক নাই।