রাজা করে রণযাত্রা, বাজে ভেরি, বাজে করতাল-- কম্পমান বসুন্ধরা। মন্ত্রী ফেলি ষড়যন্ত্রজাল রাজ্যে রাজ্যে বাধায় জটিল গ্রন্থি। বাণিজ্যের স্রোত ধরণী বেষ্টন করে জোয়ার-ভাঁটায়। পণ্যপোত ধায় সিন্ধুপারে-পারে। বীরকীর্তিস্তম্ভ হয় গাঁথা লক্ষ লক্ষ মানবকঙ্কালস্তূপে, ঊর্ধ্বে তুলি মাথা চূড়া তার স্বর্গ-পানে হানে অট্টহাস। পণ্ডিতেরা-- আক্রমণ করে বারম্বার পুঁথির-প্রাচীর-ঘেরা দুর্ভেদ্য বিদ্যার দুর্গ। খ্যাতি তার ধায় দেশে দেশে। হেথা গ্রামপ্রান্তে নদী বহি চলে প্রান্তরের শেষে ক্লান্ত স্রোতে। তরীখানি তুলি লয়ে নববধূটিরে চলে দূর পল্লী-পানে। সূর্য অস্ত যায়। তীরে তীরে স্তব্ধ মাঠ। দুরুদুরু বালিকার হিয়া। অন্ধকারে ধীরে ধীরে সন্ধ্যাতারা দেখা দেয় দিগন্তের ধারে।
সাড়ে নটা বেজেছে ঘড়িতে; সকালের মৃদু শীতে তন্দ্রাবেশে হাওয়া যেন রোদ পোহাইতেছে পাহাড়ের উপত্যকা-নিচে বনের মাথায় সবুজের আমন্ত্রণ-বিছানো পাতায়। বৈঠকখানার ঘরের রেড়িয়োতে সমুদ্রপারের দেশ হতে আকাশে প্লাবন আনে সুরের প্রবাহে, বিদেশিনী বিদেশের কণ্ঠে গান গাহে বহু যোজনের অন্তরালে। সব তার লুপ্ত হয়ে মিলেছে কেবল সুরে তালে। দেহহীন পরিবেশহীন গীতস্পর্শ হতেছে বিলীন সমস্ত চেতনা ছেয়ে। যে বেলাটি বেয়ে এল তার সাড়া সে আমার দেশের সময়-সূত্র-ছাড়া। একাকিনী, বহি রাগিণীর দীপশিখা আসিছে অভিসারিকা সর্বভারহীনা; অরূপা সে, অলক্ষিত আলোকে আসীনা। গিরিনদীসমুদ্রের মানে নি নিষেধ, করিয়াছে ভেদ পথে পথে বিচিত্র ভাষার কলরব, পদে পদে জন্ম-মৃত্যু বিলাপ-উৎসব। রণক্ষেত্রে নিদারুণ হানাহানি, লক্ষ লক্ষ গৃহকোণে সংসারের তুচ্ছ কানাকানি, সমস্ত সংসর্গ তার একান্ত করেছে পরিহার। বিশ্বহারা একখানি নিরাসক্ত সংগীতের ধারা। যক্ষের বিরহগাথা মেঘদূত সেও জানি এমনিই অদ্ভুত। বাণীমূর্তি সেও একা। শুধু নামটুকু নিয়ে কবির কোথাও নেই দেখা। তার পাশে চুপ সেকালের সংসারের সংখ্যাহীন রূপ। সেদিনের যে প্রভাতে উজ্জয়িনী ছিল সমুজ্জ্বল জীবনে উচ্ছল ওর মাঝে তার কোনো আলো পড়ে নাই। রাজার প্রতাপ সেও ওর ছন্দে সম্পূর্ণ বৃথাই। যুগ যুগ হয়ে এল পার কালের বিপ্লব বেয়ে, কোনো চিহ্ন আনে নাই তার। বিপুল বিশ্বের মুখরতা উহার শ্লোকের পটে স্তব্ধ করে দিল সব কথা।
দেখছ না কি, নীল মেঘে আজ আকাশ অন্ধকার। সাত সমুদ্র তেরো নদী আজকে হব পার। নাই গোবিন্দ, নাই মুকুন্দ, নাইকো হরিশ খোঁড়া। তাই ভাবি যে কাকে আমি করব আমার ঘোড়া। কাগজ ছিঁড়ে এনেছি এই বাবার খাতা থেকে, নৌকো দে না বানিয়ে, অমনি দিস, মা, ছবি এঁকে। রাগ করবেন বাবা বুঝি দিল্লি থেকে ফিরে? ততক্ষণ যে চলে যাব সাত সমুদ্র তীরে। এমনি কি তোর কাজ আছে, মা, কাজ তো রোজই থাকে। বাবার চিঠি এক্খুনি কি দিতেই হবে ডাকে? নাই বা চিঠি ডাকে দিলে আমার কথা রাখো, আজকে না হয় বাবার চিঠি মাসি লিখুন নাকো! আমার এ যে দরকারি কাজ বুঝতে পার না কি? দেরি হলেই একেবারে সব যে হবে ফাঁকি। মেঘ কেটে যেই রোদ উঠবে বৃষ্টি বন্ধ হলে সাত সমুদ্র তেরো নদী কোথায় যাবে চলে!