কেন চেয়ে আছ, গো মা, মুখপানে! এরা চাহে না তোমারে চাহে না যে, আপন মায়েরে নাহি জানে। এরা তোমায় কিছু দেবে না, দেবে না-- মিথ্যা কহে শুধু কত কী ভানে। তুমি তো দিতেছ মা, যা আছে তোমারি-- স্বর্ণশস্য তব,জাহ্নবীবারি, জ্ঞান ধর্ম কত পুণ্যকাহিনী। এরা কী দেবে তোরে, কিছু না, কিছু না-- মিথ্যা কবে শুধু হীন পরানে! মনের বেদনা রাখো মা মনে, নয়নবারি নিবারো নয়নে, মুখ লুকাও মা, ধূলিশয়নে-- ভুলে থাকো যত হীন সন্তানে। শূন্য-পানে চেয়ে প্রহর গণি গণি দেখো কাটে কি না দীর্ঘ রজনী, দুঃখ জানায়ে কী হবে জননী, নির্মম চেতনহীন পাষাণে।
এই মহাবিশ্বতলে যন্ত্রণার ঘূর্ণযন্ত্র চলে, চূর্ণ হতে থাকে গ্রহতারা। উৎক্ষিপ্ত স্ফুলিঙ্গ যত দিক্ বিদিকে অস্তিত্বের বেদনারে প্রলয়দুঃখের রেণুজালে ব্যাপ্ত করিবারে ছোটে প্রচণ্ড আবেগে। পীড়নের যন্ত্রশালে চেতনার উদ্দীপ্ত প্রাঙ্গণে কোথা শেল শূল যত হতেছে ঝংকৃত, কোথা ক্ষতরক্ত উৎসারিছে। মানুষের ক্ষুদ্র দেহ, যন্ত্রণার শক্তি তার কী দুঃসীম। সৃষ্টি ও প্রলয়-সভাতলে-- তার বহ্নিরসপাত্র কী লাগিয়া যোগ দিল বিশ্বের ভৈরবীচক্রে, বিধাতার প্রচণ্ড মত্ততা-- কেন এ দেহের মৃৎভাণ্ড ভরিয়া রক্তবর্ণ প্রলাপেরে অশ্রুস্রোতে করে বিপ্লাবিত। প্রতি ক্ষণে অন্তহীন মূল্য দিল তারে মানবের দুর্জয় চেতনা, দেহদুঃখ-হোমানলে যে অর্ঘ্যের দিল সে আহুতি-- জ্যোতিষ্কের তপস্যায় তার কি তুলনা কোথা আছে। এমন অপরাজিত বীর্যের সম্পদ, এমন নির্ভীক সহিষ্ণুতা, এমন উপেক্ষা মরণেরে, হেন জয়যাত্রা বহ্নিশয্যা মাড়াইয়া দলে দলে দুঃখের সীমান্ত খুঁজিবারে নামহীন জ্বালাময় কী তীর্থের লাগি-- সাথে সাথে পথে পথে এমন সেবার উৎস আগ্নেয় গহ্বর ভেদ করি অফুরান প্রেমের পাথেয়।