তুমি আমার আপন, তুমি আছ আমার কাছে, এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও। তোমার মাঝে মোর জীবনের সব আনন্দ আছে, এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও। আমায় দাও সুধাময় সুর, আমার বাণী করো সুমধুর; আমার প্রিয়তম তুমি, এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও। এই নিখিল আকাশ ধরা এই যে তোমায় দিয়ে ভরা, আমার হৃদয় হতে এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও। দুখি জেনেই কাছে আস, ছোটো বলেই ভালোবাস, আমার ছোটো মুখে এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও।
যখন দিনের শেষে চেয়ে দেখি সমুখপানে সূর্য ডোবার দেশে মনের মধ্যে ভাবি অস্তসাগর-তলায় গেছে নাবি অনেক সূর্য-ডোবার সঙ্গে অনেক আনাগোনা, অনেক দেখাশোনা, অনেক কীর্তি, অনেক মূর্তি, অনেক দেবালয়, শক্তিমানের অনেক পরিচয়। তাদের হারিয়ে-যাওয়ার ব্যাথায় টান লাগে না মনে, কিন্তু যখন চেয়ে দেখি সামনে সবুজ বনে ছায়ায় চরছে গোরু, মাঝ দিয়ে তার পথ গিয়েছে সরু, ছেয়ে আছে শুক্নো বাঁশের পাতায়, হাট করতে চলে মেয়ে ঘাসের আঁঠি মাথায়, তখন মনে হঠাৎ এসে এই বেদনাই বাজে-- ঠাঁই রবে না কোনোকালেই ঐ যা-কিছুর মাঝে। ঐ যা-কিছুর ছবির ছায়া দুলেছে কোন্কালে শিশুর-চিত্ত-নাচিয়ে-তোলা ছড়াগুলির তালে-- তিরপূর্নির চরে বালি ঝুর্ঝুর্ করে, কোন্ মেয়ে সে চিকন-চিকন চুল দিচ্ছে ঝাড়ি, পরনে তার ঘুরে-পড়া ডুরে একটি শাড়ি। ঐ যা-কিছু ছবির আভাস দেখি সাঁঝের মুখে মর্ত্যধরার পিছু-ডাকা দোলা লাগায় বুকে।
কে জানে এ কি ভালো? আকাশ-ভরা কিরণধারা আছিল মোর তপন-তারা, আজিকে শুধু একেলা তুমি আমার আঁখি-আলো-- কে জানে এ কি ভালো? কত-না শোভা, কত-না সুখ, কত-না ছিল অমিয়-মুখ, নিত্য-নব পুষ্পরাশি ফুটিত মোর দ্বারে-- ক্ষুদ্র আশা ক্ষুদ্র স্নেহ মনের ছিল শতেক গেহ, আকাশ ছিল, ধরণী ছিল আমার চারি ধারে-- কোথায় তারা, সকলে আজি তোমাতেই লুকালো। কে জানে এ কি ভালো? কম্পিত এ হৃদয়খানি তোমার কাছে তাই। দিবসনিশি জাগিয়া আছি, নয়নে ঘুম নাই। সকল গান সকল প্রাণ তোমারে আমি করেছি দান-- তোমারে ছেড়ে বিশ্বে মোর তিলেক নাহি ঠাঁই। সকল পেয়ে তবুও যদি তৃপ্তি নাহি মেলে, তবুও যদি চলিয়া যাও আমারে পাছে ফেলে, নিমেষে সব শূন্য হবে তোমারি এই আসন ভবে, চিহ্নসম কেবল রবে মৃত্যু-রেখা কালো। কে জানে এ কি ভালো?