বর্ষা নেমেছে প্রান্তরে অনিমন্ত্রণে; ঘনিয়েছে সার-বাঁধা তালের চূড়ায়, রোমাঞ্চ দিয়েছে বাঁধের কালো জলে। বর্ষা নামে হৃদয়ের দিগন্তে যখন পারি তাকে আহ্বান করতে। কিছুকাল ছিলেম বিদেশে। সেখানকার শ্রাবণের ভাষা আমার প্রাণের ভাষার সঙ্গে মেলেনি। তার অভিষেক হল না আমার অন্তরপ্রাঙ্গণে। সজল মেঘ-শ্যামলের সঞ্চরণ থেকে বঞ্চিত জীবনে কিছু শীর্ণতা রয়ে গেল বনস্পতির অঙ্গের আয়তি ঐ তো দেয় বাড়িয়ে বছরে বছরে; তার কাষ্ঠফলকে চক্রচিহ্নে স্বাক্ষর যায় রেখে। তেমনি ক'রে প্রতি বছরে বর্ষার আনন্দ আমার মজ্জার মধ্যে রসসম্পদ কিছু যোগ করে। প্রতিবার রঙের প্রলেপ লাগে জীবনের পটভূমিকায় নিবিড়তর ক'রে; বছরে বছরে শিল্পকারের অঙ্গুরি-মুদ্রার গুপ্ত সংকেত অঙ্কিত হয় অন্তর-ফলকে। নিরালায় জানলার কাছে বসেছি যখন নিষ্কর্মা প্রহরগুলো নিঃশব্দ চরণে কিছু দান রেখে গেছে আমার দেহলিতে; জীবনের গুপ্ত ধনের ভাণ্ডারে পুঞ্জিত হয়েছে বিস্মৃত মুহূর্তের সঞ্চয়। বহু বিচিত্রের কারুকলায় চিত্রিত এই আমার সমগ্র সত্তা তার সমস্ত সঞ্চয় সমস্ত পরিচয় নিয়ে কোনো যুগে কি কোনো দিব্যদৃষ্টির সম্মুখে পরিপূর্ণ অবারিত হবে? তার সকল তপস্যায় সে চেয়েছে গোচরতাকে; বলেছে, যেমন বলে গোধূলির অস্ফুট তারা, বলেছে, যেমন বলে নিশান্তের অরুণ আভাস,-- "এস প্রকাশ, এস।" কবে প্রকাশ হবে পূর্ণ, আপনি প্রত্যক্ষ হব আপনার আলোতে বধূ যেমন সত্য ক'রে জানে আপনাকে, সত্য ক'রে জানায়, যখন প্রাণে জাগে তার প্রেম, যখন দুঃখকে পারে সে গলার হার করতে, যখন দৈন্যকে দেয় সে মহিমা, যখন মৃত্যুতে ঘটে না তার অসমাপ্তি।
তখন নিশীথরাত্রি; গেলে ঘর হতে যে পথে চল নি কভু সে অজানা পথে। যাবার বেলায় কোনো বলিলে না কথা, লইয়া গেলে না কারো বিদায়বারতা। সুপ্তিমগ্ন বিশ্ব-মাঝে বাহিরিলে একা-- অন্ধকারে খুঁজিলাম, না পেলাম দেখা। মঙ্গলমুরতি সেই চিরপরিচিত অগণ্য তারার মাঝে কোথায় অন্তর্হিত! গেলে যদি একেবারে গেলে রিক্ত হাতে? এ ঘর হইতে কিছু নিলে না কি সাথে? বিশ বৎসরের তব সুখদুঃখভার ফেলে রেখে দিয়ে গেলে কোলেতে আমার! প্রতিদিবসের প্রেমে কতদিন ধরে যে ঘর বাঁধিলে তুমি সুমঙ্গল-করে পরিপূর্ণ করি তারে স্নেহের সঞ্চয়ে, আজ তুমি চলে গেলে কিছু নাহি লয়ে? তোমার সংসার-মাঝে, হায়, তোমা-হীন এখনো আসিবে কত সুদিন-দুর্দিন-- তখন এ শূন্য ঘরে চিরাভ্যাস-টানে তোমারে খুঁজিতে এসে চাব কার পানে? আজ শুধু এক প্রশ্ন মোর মনে জাগে-- হে কল্যাণী, গেলে যদি, গেলে মোর আগে, মোর লাগি কোথাও কি দুটি স্নিগ্ধ করে রাখিবে পাতিয়া শয্যা চিরসন্ধ্যা-তরে?