আমার নয়ন তব নয়নের নিবিড় ছায়ায় মনের কথার কুসুমকোরক খোঁজে। সেথায় কখন্ অগম গোপন গহন মায়ায় পথ হারাইল ও-যে। আতুর দিঠিতে শুধায় সে নীরবেরে, নিভৃত বাণীর সন্ধান নাই যে রে; অজানার মাঝে অবুঝের মতো ফেরে অশ্রুধারায় ম'জে। আমার হৃদয়ে যে কথা লুকানো, তার আভাষণ ফেলে কভু ছায়া তোমার হৃদয়তলে? দুয়ারে এঁকেছি রক্ত রেখায় পদ্ম-আসন, সে তোমারে কিছু বলে? তব কুঞ্জের পথ দিয়ে যেতে যেতে বাতাসে বাতাসে ব্যথা দিই মোর পেতে, বাঁশি কী আশায় ভাষা দেয় আকাশেতে সে কি কেহ নাহি বোঝে।
পুজোর ছুটি আসে যখন বকসারেতে যাবার পথে-- দূরের দেশে যাচ্ছি ভেবে ঘুম হয় না কোনো মতে। সেখানে যেই নতুন বাসায় হপ্তা দুয়েক খেলায় কাটে দূর কি আবার পালিয়ে আসে আমাদেরি বাড়ির ঘাটে! দূরের সঙ্গে কাছের কেবল কেনই যে এই লুকোচুরি, দূর কেন যে করে এমন দিনরাত্তির ঘোরাঘুরি। আমরা যেমন ছুটি হলে ঘরবাড়ি সব ফেলে রেখে রেলে চড়ে পশ্চিমে যাই বেরিয়ে পড়ি দেশের থেকে, তেমনিতরো সকালবেলা ছুটিয়ে আলো আকাশেতে রাতের থেকে দিন যে বেরোয় দূরকে বুঝি খুঁজে পেতে? সে-ও তো যায় পশ্চিমেতেই, ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যে হলে, তখন থেকে রাতের মাঝেই দূর সে আবার গেছে চলে। সবাই যেন পলাতকা মন টেকে না কাছের বাসায়। দলে দলে পলে পলে কেবল চলে দূরের আশায়। পাতায় পাতায় পায়ের ধ্বনি, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ডাকাডাকি, হাওয়ায় হাওয়ায় যাওয়ার বাঁশি কেবল বাজে থাকি থাকি। আমায় এরা যেতে বলে, যদি বা যাই, জানি তবে দূরকে খুঁজে খুঁজে শেষে মায়ের কাছেই ফিরতে হবে।
কল্যাণীয় শ্রীসুরেন্দ্রনাথ কর বহু লোক এসেছিল জীবনের প্রথম প্রভাতে -- কেহ বা খেলার সাথী, কেহ কৌতূহলী, কেহ কাজে সঙ্গ দিতে, কেহ দিতে বাধা। আজ যারা কাছে আছ এ নিঃস্ব প্রহরে, পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তেজ আলোয় তোমরা আপন দীপ আনিয়াছ হাতে, খেয়া ছাড়িবার আগে তীরের বিদায়স্পর্শ দিতে। তোমরা পথিকবন্ধু, যেমন রাত্রির তারা অন্ধকারে লুপ্তপথ যাত্রীর শেষের ক্লিষ্ট ক্ষণে।