অসীম আকাশে মহাতপস্বী মহাকাল আছে জাগি। আজিও যাহারে কেহ নাহি জানে, দেয় নি যে দেখা আজো কোনোখানে, সেই অভাবিত কল্পনাতীত আবির্ভাবের লাগি মহাকাল আছে জাগি। বাতাসে আকাশে যে নবরাগিণী জগতে কোথাও কখনো জাগে নি রহস্যলোকে তারি গান সাধা চলে অনাহত রবে। ভেঙে যাবে বাঁধ স্বর্গপুরের, প্লাবন বহিবে নূতন সুরের, বধির যুগের প্রাচীন প্রাচীর ভেসে চলে যাবে তবে। যার পরিচয় কারো মনে নাই, যার নাম কভু কেহ শোনে নাই, না জেনে নিখিল পড়ে আছে পথে যার দরশন মাগি-- তারি সত্যের অপরূপ রসে চমকিবে মন অভূত পরশে, মৃত পুরাতন জড় আবরণ মুহূর্তে যাবে ভাগি, যুগ যুগ ধরি তাহার আশায় মহাকাল আছে জাগি।
ওরা এসে আমাকে বলে, কবি, মৃত্যুর কথা শুনতে চাই তোমার মুখে। আমি বলি, মৃত্যু যে আমার অন্তরঙ্গ, জড়িয়ে আছে আমার দেহের সকল তন্তু। তার ছন্দ আমার হৃৎস্পন্দনে, আমার রক্তে তার আনন্দের প্রবাহ। বলছে সে,--চলো চলো, চলো বোঝা ফেলতে ফেলতে, চলো মরতে মরতে নিমেষে নিমেষে আমারি টানে, আমারি বেগে। বলছে, চুপ করে বস যদি যা-কিছু আছে সমস্তকে আঁকড়িয়ে ধরে তবে দেখবে, তোমার জগতে ফুল গেল বাসি হয়ে, পাঁক দেখা দিল শুকনো নদীতে, ম্লান হল তোমার তারার আলো। বলছে, "থেমো না, থেমো না, পিছনে ফিরে তাকিয়ো না, পেরিয়ে যাও পুরোনোকে জীর্ণকে ক্লান্তকে অচলকে। "আমি মৃত্যু-রাখাল সৃষ্টিকে চরিয়ে চরিয়ে নিয়ে চলেছি যুগ হতে যুগান্তরে নব নব চারণ-ক্ষেত্রে। "যখন বইল জীবনের ধারা আমি এসেছি তার পিছনে পিছনে, দিইনি তাকে কোনো গর্তে আটক থাকতে। তীরের বাঁধন কাটিয়ে কাটিয়ে ডাক দিয়ে নিয়ে গেছি মহাসমুদ্রে, সে সমুদ্র আমিই। "বর্তমান চায় বর্তিয়ে থাকতে। সে চাপাতে চায় তার সব বোঝা তোমার মাথায়, বর্তমান গিলে ফেলতে চায় তোমার সব-কিছু আপন জঠরে। তার পরে অবিচল থাকতে চায় আকণ্ঠপূর্ণ দানবের মতো জাগরণহীন নিদ্রায়। তাকেই বলে প্রলয়। এই অনন্ত অচঞ্চল বর্তমানের হাত থেকে আমি সৃষ্টিকে পরিত্রাণ করতে এসেছি, অন্তহীন নব নব অনাগতে।"